শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

করোনা কালে কোরবানি ও এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-ইমদাদ ইসলাম

আগামী ২১ জুলাই করোনা মহামারির মধ্যে পালিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রতিদিনই করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দেশ এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনায় মৃত্যুর দিক দিয়ে এখন বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের একটি।নতুন রোগী শনাক্তের দিক বিবেচনায় সারাবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২ তম।খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামে করোনার প্রভাব বেশি। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার কালবিলম্ব না করে ০১ জুলাই থেকে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে। ঈদ কেন্দ্রিক যাতায়াত, কোরবানির পশুর হাটে লোকসমাগম বাড়লে এবং স্বাস্হ্যবিধি না মানলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঈদুল আজহার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করা। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী এ বছর দেশে কোরবানির জন্য পশুর চাহিদা কম বেশি ৯৫ লাখ থেকে ০১ কোটি ১০ লাখ। দেশে কোরবানির যোগ্য পশু রয়েছে ০১ কোটি ১৯ লাখের ও বেশি। এ সকল কোরবানির একটা বড়ো অংশ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সম্পূর্ণ হবে। করোনাকালে দেশের নাগরিকদের পশুর হাটে যেয়ে পশু কেনাকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ০৮ শতটির মতো পশু ক্রয়ের অনলাইন প্লাটফর্ম চালু হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে ০৫ শত ৩০টি এবং বাকীগুলো বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। গত ০২ জুলাই থেকে এ সকল অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন চার হাজারের ও বেশি পশু বিক্রি হচ্ছে। এটি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হচ্ছে। বেঙ্গল মিট, কিউকম ডটকম, ডিজিটাল হাট, প্রিয় শপ, দেশি গরু, ই-বাজার, আজকের ডিল, বিক্রয় ডটকম ইতিমধ্যে জনগণের নিকট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনলাইনে কোরবানির পশু ক্রয়ের একমাত্র ডিজিটাল প্লাটফর্ম ডিজিটাল হাট ডট নেট। বেঙ্গল মিট ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোরবানির পশু ক্রয় করে তাদেরকে কোরবানি করার দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় সকল বিধিবিধান পালন পূর্বক কোরবানি সম্পন্ন করে মাংস তাদের নিজ দায়িত্বে চব্বিশ ঘন্টারও কম সময়ে পৌঁছে দিয়ে থাকে। ঢাকা শহরে এ সকল মাংস কোরবানির দিন সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে দিয়ে থাকে। এসকল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি দেওয়া হলে সময়, ও অর্থের সাশ্রয় হবে এবং করোনাকালে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়াও এ সকল প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে বর্জ্য ব্যবস্হাপনা করে থাকে বিধায় পরিবেশের জন্য এটা সহায়ক। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্মানিত মেয়রদ্বয় ইতিমধ্যে করোনাকালে সরাসরি হাটে না যেয়ে ডিজিটাল হাট থেকে পশু ক্রয় করার জন্য সিটি কর্পোরেশনের নাগরিকদের অনুরোধ করেছেন।

আমাদের দেশে সকলে মিলে উৎসবমুখর পরিবেশে কোরবানির পশু হাট থেকে ক্রয় করে বাসায় নিয়ে আসার কালচার রয়েছে। কিন্তু আমাদের সকলকে এই করোনা মহামারির সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। দলবেঁধে পশুর হাটে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। লোকসমাগম যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
যত্রতত্র কোরবানি না দিয়ে কর্তৃপক্ষের নির্বাচিত নির্দিষ্ট জায়গায় কোরবানি দেওয়া হলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। এসব জায়গায় কর্তৃপক্ষ পূর্ব থেকেই সকল প্রকার সহায়তার ব্যবস্হা করে থাকে, ফলে কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এর মোট ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলোকে ১০টি জোনে ভাগ করা আছে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মোট এলাকা প্রায় একশ দশ কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ০১ কোটি ২০ লাখ। এখানে অনুমোদিত ডাস্টবিন আছে ৪ হাজার ১৫৫টি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে ৫ হাজার ৪ শত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের জন্য ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্মানিত নাগরিকদের করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছে। কোরবানির পশুর বর্জ্য কোরবানির দিন দুপুর থেকে অপসারণের জন্য সকল প্রকার ব্যবস্হা গ্রহণ করা হয়েছে এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সকল বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

-২-

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মোট ৫৪ টি ওয়ার্ড রয়েছে। এগুলোকে ১০ টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মোট জনসংখ্যা প্রায় ০১ কোটি। মোট আয়তন ১শত ৯৬ বর্গ কিলোমিটারের ও বেশি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী সবমিলিয়ে ৪ হাজার ৫ শত জন। কন্টেইনার কেরিয়ার ৪৪টি, আর্ম রোল ০৮ টি,কম্পপ্যাকটর ৪৬ টি, খোলা ট্রাক ৩২টি, ড্রাম ট্রাক ৩৪ টি। এ সকল সরঞ্জাম ও জনবলের মাধ্যমে কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সম্মানিত মেয়র মহোদয় ইতিমধ্যে নগরবাসীকে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন। এ জন্য নগরবাসীকে সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, তথ্য অধিদফতর, চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভি এ প্রচার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ‘সবার ঢাকা’ নামে একটি অ্যাপস চালু আছে। এটি ডিএনসিসির সিটিজেন এনগেজমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্লাটফর্ম। এ অ্যাপসটি ব্যবহার করে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সন্মানিত নাগরিকরা তাদের এলাকার সমস্যা বা মতামত মেয়র মহোদয়কে জানাতে পারেন। উত্তর সিটি কর্পোরেশন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও কোরবানির দিন দুপুর থেকে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

কোরবানির যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হবে তা অপসারণের দায়িত্ব শুধু দুই সিটি কর্পোরেশনকে দিলে হবে না, এজন্য ব্যক্তি পর্যায়েও অনেক কিছু করণীয় আছে। পশুর মাংস কাটার সময় উচ্ছিষ্টগুলো সিটি কর্পোরেশন থেকে সরবরাহকৃত ব্যাগে ভরে সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত স্হানে রাখতে হবে। এছাড়াও কোরবানি দেওয়ার স্হানগুলোতে সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নিজ দায়িত্বে পরিস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।

কোরবানি দাতার অবহেলা ও অসচেতনতা কোরবানির পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী। মনে রাখা দরকার বর্জ্য অপসারণের প্রথম দায়িত্ব কোরবানি দাতার।যত্রতত্র কোরবানির বর্জ্য ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।ইসলাম পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ধর্ম।সিটি কর্পোরেশন থেকে এ করোনা মহামারি, চিকনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ায় নগরবাসীকে সচেতন করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা, বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের জন্য পশুর জন্য কেনা খড়কুটো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। পশু রাখার জায়গা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিস্কার করতে হবে। পশু জবাইয়ের পর রক্ত ও ময়লা ব্লিচিং পাউডার ও পানি দিয়ে পরিস্কার করতে হবে।অযথা পানির অপচয় করা যাবে না। যে পোশাক পরে পশু জবাই করা হয়েছে বা মাংস কাটা হয়েছে সেগুলো ভালো করে পরিস্কার করতে হবে। কোরবানি ও পশুর মাংস কাটার সময় অযথা ভিড় করা যাবে না। সমাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পশুর চামড়া দ্রুত বিক্রি অথবা দান করে দিতে হবে।

পশু কোরবানির মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে ত্যাগের শিক্ষা দেয় তা যেন আমরা শুধু কোরবানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখি। এ ত্যাগ আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশেষ করে এই মহামারি করোনাকালে সবাই সবার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ত্যাগ স্বীকারে এগিয়ে এসে সহযোগিতার হাত বাড়াই। কোনো দরিদ্র অসহায় পরিবার যেন আমাদের থেকে বঞ্চিত না হয় সেটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি