বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
কুষ্টিয়ায় সাব রেজিস্ট্রার হত্যা মামলায় ৪ আসামির ফাঁসি ও ১ জনের যাবজ্জীবন মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বাইসাইকেল বিতরণ করেন বিশ্বে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছাড়াল ২৩ কোটি বিশ্বনেতাদের সামনে যে ৩ প্রস্তাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী মনে হচ্ছে আমি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ দাঁড়াবে না : পাপন পলাশের জিনারদীতে প্রফেসর কামরুল ইসলাম গাজীর উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত বরগুনার তালতলীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ, যুবক কারাগারে প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘের এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার প্রদান পূর্ণিমা ভক্তদের জন্য সুখবর ভালোবাসা ও লড়াইয়ের নতুন বার্তা দিলেন নুসরাত

দরিদ্রতা হ্রাসে বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা

বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে ব্যক্তিগত ব্যয় এশিয়ার মধ্যে সর্বাধিক। চিকিৎসাসেবা গ্রহণে অত্যধিক ব্যয়ের মূল কারণ হচ্ছে সরকারি আনুকূল্যে ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, রোগ নির্ণয় এবং শৈল্য চিকিৎসায় কল্পনাতীত অতিরিক্ত চার্জ ও অপচিকিৎসা। শৈল্য চিকিৎসায় কত গুণ চার্জ করা হয়, সে সম্পর্কে দু’একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

বয়োবৃদ্ধদের ছানি কেটে চোখে নতুন লেন্স বসাতে (আইওএল) সর্বসাকল্যে খরচ ২ হাজার টাকার অনধিক। ফেকো পদ্ধতিতে ছানি কাটার অপারেশন করলে খরচ দ্বিগুণ। এ পদ্ধতিতে অপারেশন করলে রোগীর সময় সাশ্রয় হয়। বয়োবৃদ্ধদের এত সময় সাশ্রয়ের প্রয়োজন কতটুকু, তা বিবেচ্য হওয়া উচিত। বিভিন্ন ক্লিনিকে আইওএলের জন্য ৫০ হাজার টাকা বা ততোধিক এবং ফেকো অপারেশনের জন্য এক থেকে দেড় লাখ টাকা চার্জ করা হয়। কতিপয় চক্ষু চিকিৎসক ভাঁওতা দিয়ে ৫০ হাজার টাকায় প্রদাহ নিবারক ইনজেকশনও বিক্রি করে থাকেন ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির অনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে। এরূপ অতিরিক্ত চার্জ দিনদুপুরে ডাকাতিতুল্য নয় কি? শিক্ষিত জনসাধারণ ও সাংবাদিকরাও এরূপ অত্যধিক অস্বাভাবিক চার্জ সম্পর্কে প্রায়ই কোনো প্রশ্ন তোলেন না।

১৯৯৪ সালে বিআইডিএস গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন, বাংলাদেশের দরিদ্রতা হ্রাস না পাওয়ার তিনটি কারণের মধ্যে দ্বিতীয় মুখ্য কারণ ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা, চিকিৎসায় অত্যধিক ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শবঞ্চিত হওয়া। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনও সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণে অত্যধিক ব্যয়কে দরিদ্র পরিবারের ক্রমাবনতির জন্য দায়ী করেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একশ বছর আগে ১৮৭১ সালে জার্মান রাজনীতিবিদ ওটো ভন বিসমার্ক বহু অঞ্চলে বিভক্ত জার্মানিকে একত্রিত করে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেন এবং জার্মান নাগরিকদের দেশত্যাগ প্রতিহত করার নিমিত্তে একে একে বিভিন্ন প্রকার সামাজিক বীমার প্রচলন করেন। দরিদ্র পরিবারকে নিখরচায় স্বাস্থ্য সুবিধা দিতে জার্মানিতে তিনি প্রথম সর্বজনীন স্বাস্থ্যবীমার প্রচলন করেন। বিসমার্কের সামাজিক বীমার অনুকরণে ১৮৮৮ সালে অস্ট্রিয়া, ১৮৯১ সালে হাঙ্গেরি, ১৯০১ সালে লুক্সেমবার্গ, ১৯০৯ সালে নরওয়ে ও ১৯১১ সালে সুইজারল্যান্ডে সামাজিক বীমার প্রচলন হয়। ব্রিটেনে ৬ নভেম্বর ১৯৪৬ সালে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস আইন অনুমোদিত হয় এবং ৫ জুলাই ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী এনুরিল বিভানের নেতৃত্বে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমার মাধ্যমে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস চালু হয় সব শ্রেণির চিকিৎসকের বিরোধিতা সত্ত্বেও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবীমা প্রচলনের উদ্যোগ নেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ১৯৭৩ সালে সাভারের গ্রামে স্থানীয়ভাবে প্রতি পরিবারের মাসিক দুই টাকায় স্থানীয় স্বাস্থ্যবীমার প্রচলন করে। ধনী-দরিদ্র সব পরিবারের একই প্রিমিয়াম জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ধনীরা অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিয়ে অধিকতর সুবিধা দাবি করতে থাকে এবং দরিদ্ররা কম প্রিমিয়াম যুক্তিসংগত মনে করত। পরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র সামাজিক শ্রেণিভিত্তিক স্বাস্থ্যবীমার প্রচলন করে- (১) অতি দরিদ্র, (২) দরিদ্র, (৩) নিম্ন মধ্যবিত্ত, (৪) মধ্যবিত্ত, (৫) উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং (৬) ধনী।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যবীমার সফলতা সীমিত। দরিদ্র পরিবার ৬০ শতাংশ স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণ করেছে। মধ্যবিত্তরা ১৫ শতাংশের অনধিক এবং ধনীরা আরও কম। ফলে এ স্বাস্থ্যবীমা পদ্ধতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। দরিদ্র পরিবার সামান্য প্রিমিয়াম দিয়ে থাকে। যাদের গণ স্বাস্থ্যবীমা আছে তাদের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তারা সময় ক্ষেপণ না করে দ্রুত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ফলে তাদের স্বাস্থ্য অপেক্ষাকৃত উন্নত। এদের শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু ও বয়োবৃদ্ধের মৃত্যুহার কম।

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে রিকশা ও ভ্যানচালক, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতের দোকানদার পরিবারের জন্য জুন ২০২১ সাল থেকে মাসিক ২০০ টাকা প্রিমিয়ামে বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হয়েছে। বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণকারী পরিবারের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। ১০ হাজার শ্রমজীবী পরিবার বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা গ্রহণ করলে প্রকল্পটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। নতুবা এ প্রকল্পকে আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকি দিয়ে চালু রাখতে হবে।

শ্রমজীবী পরিবার বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমার অন্তর্ভুক্ত হলে কতগুলো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমা গ্রহীতা পরিবারে রিকশা ও ভ্যানচালক, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতের দোকানদার এবং তাদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও বয়োবৃদ্ধ পিতা-মাতা বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমার অন্তর্ভুক্ত হন। তাদেরকে এনআইডি কার্ডের মতো গলায় ঝুলানো পরিচয়পত্র ও একটি বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমা বই দেওয়া হয়। তাদেরকে ধূমপান ও পান সেবন থেকে নিবৃত্ত থাকা এবং ছেলেমেয়েদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়।
বিশেষ গণ স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে করণীয় কী? প্রথমত, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী ১০ হাজার পরিবার এক একটি ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এ জন্য ব্যাপক স্থানীয় প্রচারণা ও সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, সরকারি সাহায্য বা অনুদানে স্থানীয় পর্যায়ে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা ও বয়োবৃদ্ধদের সাপ্তাহিক ক্লিনিকের জন্য আড়াই হাজার বর্গফুটের ক্লিনিকের ব্যবস্থা স্থাপনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ, টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। ক্লিনিক, ফার্মেসি, মৌলিক প্যাথলজি পরীক্ষা, দুর্ঘটনা ও পোড়া রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, আগামী ৫ বছরে স্থানীয় ক্লিনিকগুলো পরিণত হবে জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স ক্লিনিকে। এ জন্য স্থানীয় সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। স্থানীয় ক্লিনিক থেকে রোগীদের প্রয়োজনমাফিক বড় সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হবে। চতুর্থত, সারাদেশে সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা প্রচলনের জন্য প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা বেষ্টনী, গভীর নলকূপ সংস্কার ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ।

পঞ্চমত, সরকারি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, ডেন্টিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও টেকনিশিয়ান নার্সদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এসব কর্মীর নিয়োগ হবে স্থানীয় পর্যায়ে; ঢাকা থেকে নয়। স্থানীয়ভাবে পরিবার নিয়ে ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কমপক্ষে দুই বছর অবস্থান করে জনসাধারণকে চিকিৎসাসেবা না দিলে কোনো চিকিৎসক উচ্চশিক্ষার সুবিধা পাবেন না। দুই বছর পর বিভিন্ন বিষয়ে ৬ মাস কোর্স করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সার্টিফায়েড বিশেষজ্ঞ হিসেবে উন্নীত হবেন। এসব পদধারী অতিরিক্ত ভাতা এবং মেডিকেল ও প্যারামেডিকেল ছাত্ররা ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষাদানের জন্য মাসিক অধ্যাপনা ভাতা পাবেন। বিনা ভাড়ায় পাবেন বাসস্থান সুবিধাও।

ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রের নিরাপত্তা বেষ্টনী, গভীর নলকূপ ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা সমেত নূ্যনতম ১০টি পরিবার বাসস্থান, ছাত্রদের জন্য ডরমিটরি এবং ল্যাবরেটরি, বহির্বিভাগ, এক্সরে, আলট্রাসনো বিভাগ, ৩০ শয্যার অন্তঃবিভাগ ও অপারেশন থিয়েটারের সম্প্রসারণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সজ্জিত করতে হবে। এর ফলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র বিলেতের মতো স্থানীয় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত হবে। ফলে চিকিৎসকরা এ পর্যায়ে সেবা দিয়ে আনন্দ পাবেন। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা যুগের দাবি এবং আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অত্যাবশ্যক অঙ্গ।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি