শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন

অর্থনীতি গরিবের ‘ভারকি’ ও ‘বারকি’ ব্যবসা

গত ৪ আগস্ট একটি দৈনিকে ‘জলজীবিকার হাতিয়ার বারকি’ শিরোনামে প্রকাশিত ফিচারটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে। ‘বারকি’ শব্দটি দেখে আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। কারণ আশির দশকের প্রথমদিকে আমি বেশ কয়েক বছর গ্রামীণ গবেষণার কাজে নোয়াখালীর গ্রামে অবস্থান করেছিলাম। আমার গবেষণার মূল বিষয় ছিল বিভিন্ন রকমের বাজারে গ্রামীণ গৃহস্থালির বিনিময় সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করা। বিভিন্ন বাজার বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছি পণ্যের বাজার, শ্রমের বাজার এবং ঋণের বাজার। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এসব বাজার একে অপরের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। পণ্যের বাজারে গ্রামীণ পরিবারগুলো নানা ধরনের কৃষিপণ্য, জলজ পণ্য যেমন মাছ ও কাছিম, বৃক্ষজাত পণ্য যেমন ফল-ফলাদি ও জ্বালানি কাঠ এবং পশুজাত পণ্য যেমন দুগ্ধ, মাংস, হাঁস-মুরগি, ডিম প্রভৃতি বিক্রয় করে।

আবার অনেক গৃহস্থালি, যাদের এসব পণ্য নেই কিন্তু প্রয়োজন অনুভব করে, তারা এগুলো পণ্যের বাজার থেকে ক্রয় করে। আমার অনুসন্ধানের বিষয় ছিল এসব পণ্য কী শর্তে বেচাকেনা হয়। যেমন এগুলোর পরিমাণ, দাম, ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক, কত দূরের হাট থেকে এগুলো সংগ্রহ করা হয়, হাটে ইজারাদারকে কী পরিমাণ অর্থ দিতে হয়, পণ্য কোথা থেকে এসেছে, পণ্য নিয়ে দরকষাকষি কেমন ছিল ইত্যাদি। একইভাবে গ্রামীণ গৃহস্থালি শ্রমের বাজারে কী শর্তে শ্রম বেচাকেনা করেছে, যেমন মজুরির প্রকৃতি কী ছিল অর্থাৎ এর জন্য কী পরিমাণ নগদ টাকা পাওয়া গেছে অথবা দিতে হয়েছে, শ্রম ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ধরনটি কী, কত ঘণ্টার জন্য কাজ করতে হয়েছে অথবা মজুর ভাড়া করতে হয়েছে, যারা শ্রম দিয়েছে তারা কোথা থেকে এসেছে অর্থাৎ গ্রাম থেকে, গ্রামের বাইরে অন্য গ্রাম থেকে, উপজেলারও বাইরে থেকে অথবা মৌসুমি পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে। ঋণের বাজারে জানতে চেয়েছি কত টাকা ঋণ করা হয়েছে অথবা ঋণ দিয়েছে, ঋণের জন্য কী হারে সুদ দিতে হয়েছে, সুদের ধরন কী ছিল- যেমন নগদ টাকায় শ্রম দিয়ে অথবা পণ্য দিয়ে। কী উদ্দেশ্যে ঋণ করা হয়েছিল, ঋণ বিনিয়োগ করে কী পরিমাণ লাভ-ক্ষতি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে ঋণ পাওয়ার জন্য আইনগতভাবে সুদ ছাড়াও কী পরিমাণ উপরি ব্যয় করতে হয়েছে এবং ঋণদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সম্পর্কের ধরন কী ছিল।

পণ্যের বাজারে সেবারও লেনদেন হয়। সেবার ধরনটি কী, এর জন্য কী কী শর্তে লেনদেন হয়েছে। আমি যখন গবেষণা করছিলাম তখন গ্রামে ঝাড়-ফুঁক, পানিপড়া দেওয়া এবং তাবিজ-কবজ দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড প্রচলিত ছিল। যদিও এসব নিছক কুসংস্কার; তা সত্ত্বেও এসব কাজ করে খন্দকার নামক এক শ্রেণির পেশাজীবী প্রচুর আয় করত। কিন্তু তাদের আয়ের পরিমাণ জানা সহজসাধ্য ছিল না। এ জন্য আমাকে সামাজিক জরিপের নিয়ম অনুযায়ী ‘কি-ইনফরমেন্ট’ নিয়োগ করতে হয়েছিল। বলা যায়, গবেষণার জন্য এক ধরনের গোয়েন্দাবৃত্তি করা। তবে গবেষণার নৈতিকতা রক্ষার জন্য কোনো তথ্যদাতার নাম প্রকাশ করা হতো না। পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, এভাবে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহের ফলে গ্রামবাংলার অর্থনীতির চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছিল। আমি নিজে গ্রামেই অবস্থান করতাম। ফলে তথ্য সংগ্রহকারীরা সঠিকভাবে বুঝেশুনে তথ্য সংগ্রহ করছে কিনা, তার ওপর নজরদারি করা সম্ভব হয়েছিল।

পণ্যের বাজারে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক ধরনের গ্রামীণ খুদে ব্যবসার সঙ্গে পরিচয় ঘটল। সেটা ‘ভারকি’ ব্যবসা নামে এলাকায় পরিচিত ছিল। এ ব্যবসা হলো শুকনো ধান প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে চালে পরিণত করে বাজারে বিক্রয় করা। এক মণ ধান থেকে ২৫/২৬ সের চাল উৎপন্ন হতো। ধান থেকে ঢেঁকি দিয়ে ছেঁটে চাল করা হতো। একেই আমরা বলি ঢেঁকিছাঁটা চাল। এ চালের পুষ্টিমান কলেছাঁটা চালের চেয়ে বেশি। ধানভানার কাজটি গৃহস্থালির মহিলা সদস্যরা করত। এই ধান সিদ্ধ করতে হতো। এ কর্মকাণ্ডে গৃহস্থালির নারী সদস্যদের শ্রমের কাজে লাগানো হতো। বাজারে ঢেঁকিছাঁটা চাল বিক্রয় করে গরিব ও পরিশ্রমী পরিবারগুলো কিছু টাকা আয় করত।

প্রশ্ন হলো- এই খুদে ব্যবসাটির নাম ‘ভারকি’ ব্যবসা হলো কেন। পরিবারের পুরুষ সদস্য ভাঁড়ের মধ্যে চাল নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে হাট-বাজারে বিক্রয় করত। ভাঁড়ে করে চাল বাজারজাত করা হতো বলে এই খুদে ব্যবসাটির নাম ছিল ‘ভারকি’ ব্যবসা। এ ব্যবসার মাধ্যমে কার্যত পারিবারিক শ্রমই বিক্রয় করা হতো। এ থেকে লব্ধ অর্থকে মুনাফা না বলে মজুরি বলাই হয়তো যুক্তিযুক্ত। তবে শ্রমের বাজারে বিদ্যমান শ্রমের মূল্য অনুযায়ী প্রাপ্ত ঢেঁকিছাঁটা চাল থেকে অতিরিক্ত কিছু পাওয়া গেলে তাকে মুনাফা গণ্য করা যেতে পারে। নোয়াখালীর ফেনী অঞ্চলের গ্রামের গরিব পরিবারগুলো আয়-রোজগারের জন্য তাদের চাহিদাহীন শ্রমকে এভাবে বাজারে বিক্রয়যোগ্য শ্রমে পরিণত করত। দেশে চালকল বেড়ে যাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে গ্রামীণ গরিবদের আয়ের এ উৎস বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামের গরিবরা তাদের ‘সুপার হিউম্যান ইন্ডাস্ট্রি অব লেবার’ ব্যবহার করে কোনো রকমে বেঁচে থাকত। এই ‘সুপার হিউম্যান ইন্ডাস্ট্রি অব লেবার’-এর ধারণাটি জন স্টুয়ার্ট মিল তার ‘প্রিন্সিপাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। বোঝা যায়, মিলের সময়ে ইংল্যান্ডের গরিবরা বাংলাদেশের গরিবদের চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল না।

আলোচ্য ফিচারে লেখা হয়েছে-নৌকার নাম ‘বারকি’, লম্বাকৃতির দৈর্ঘ্যে ৩৬ ফুট, প্রস্থে সাড়ে চার ফুট। সামনে ও পেছনে কাঠের তক্তা দিয়ে একাধিক বসার স্থান। গলুইয়ের এক পাশে বসে চালাতে হয় নৌকা। নৌকার মাঝখানে পুরোটা ফাঁকা। এই ফাঁকা জায়গায় বহন করা হয় বালু অথবা পাথর। বর্ষাকালে শ্রমজীবীদের জলজীবিকার হাতিয়ার এই ‘বারকি’। বারকি নৌকায় বালু কিংবা পাথর বোঝাই কাজে পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা অংশগ্রহণ করে। বর্ষাকালে বারকি নৌকার ব্যবহার কৃষিতে কর্মহীন সময়কে কর্মচঞ্চল করে তোলে। কবে থেকে বারকি নৌকার প্রচলন, তা স্পষ্ট নয়। তবে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ‘বারকি’ নামটি এসেছে এক ব্রিটিশ নাগরিকের নাম থেকে। সুনামগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী সম্পাদিত ‘সুনামগঞ্জ পরিচিতি’ গ্রন্থে এ তথ্য স্থান পেয়েছে। বারকি নৌকা ও বারকি শ্রম প্রসঙ্গে বইটিতে বলা হয়েছে, ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে সিলেট অঞ্চলে নৌকার প্রচলন হয়। এ তথ্যটি সম্পর্কে আমি কিছুটা সন্দিহান। কারণ, নদীমাতৃক বাংলায় নৌকার প্রচলন হয়েছে আরও কয়েকশ বছর আগে। বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে জলযান হিসেবে নৌকার ব্যবহার মধ্যযুগের বাংলাতেও ছিল। যাই হোক, ওই ফিচার অনুযায়ী, পূর্বোক্ত সময়ে (১৭৫৭-১৯০০) মি. জন বারকি নামে এক ব্রিটিশ নাগরিকের নকশায় তৈরি হয় লম্বাকৃতির একটি নৌকা। তখন শুধু চুনাপাথর এ নৌকায় পরিবহন করা হতো। জলপথে ভারী চুন পরিবহনে লম্বাকৃতির সোজাসাপটাভাবে তৈরি নৌকা তার নামেই প্রচলিত হয়।

সিলেট অঞ্চলে মোটা দানার বালু, নুড়িপাথর ও চুনাপাথর প্রাকৃতিক উৎস থেকে ব্যাপক পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই সিলেটে এসব সামগ্রী সংগ্রহ ও বিপণনে নৌকার ব্যবহার প্রচলিত। এর ফলে গরিব মানুষদের উদ্বৃত্ত শ্রম ব্যবহারের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। অন্যথায় এই শ্রম পচনশীল হয়ে যেত। কোনো কাজে লাগত না। যারা বারকি নৌকা ভাড়া করে বালু ও পাথর পরিবহন করে, তারা নৌকার ভাড়া বাবদ ২০০ টাকা নৌকার মালিককে দিতে বাধ্য থাকে। এর পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনের ৮০০-১০০০ টাকা রোজগার হয়। আজর আলী নামে এক নৌকার মাঝি বলেছেন, ‘বাইরা মাস (বর্ষাকাল) তো, কাজকাম নাই। হাতে বারকি না থাকলে উপাস থাকতে হইত।

বাংলাদেশের ভূমিহীন বা প্রান্তিক মানুষদের জন্য ভূমিবহির্ভূত কর্মসংস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যতই দিন যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বা অন্যান্য কারণে নির্দিষ্ট ধরনের ভূমিবহির্ভূত কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নতুন ধরনের ভূমিবহির্ভূত কর্মসংস্থানের উদ্ভব হচ্ছে। সিলেটের বারকি নৌকায় কাজ করা মানুষ রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে, বালু বা পাথরের উৎস যেহেতু নদী, সেহেতু বারকি নৌকার প্রয়োজন থাকবে; সীমিত আকারে হলেও। ফেনী ও সিলেটের দুটি ভিন্ন গল্প থেকে জানা গেল, ভূমিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড স্থানীয় অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অনেক এলাকায় এগুলোর মিল থাকলেও বৈচিত্র্য কম নয়।
অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি