বৃহস্পতিবার, ১৮ অগাস্ট ২০২২, ০৯:৫৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম
গাজীপুর প্রেসক্লাবে মাসুদুল হক সভাপতি, মাহতাব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত রেল লাইনে পাথর নেই, মারাত্নক ঝুকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার প্রতিবাদে বিহ্মোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় দেশে পরিবেশ বান্ধব কৃষি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের আহবান বোপমা সভাপতির হাতীবান্ধায় প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ মামলার মূল আসামী শাহিন গ্রেফতার সিরিজ বোমা হামলার প্রতিবাদে বরিশালে আ.লীগের বিক্ষোভ মিছিল খেলাপি বৃদ্ধির শীর্ষে ২০ ব্যাংক বিমানবন্দরে ভক্তদের উদ্দেশ্যে যা বললেন শাকিব খান বরিশাল শেবাচিমে অধ্যক্ষের কার্যালয় ঘেরাও করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তেলের দাম বাড়ায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন: বাণিজ্যমন্ত্রী

চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব অগ্রগতি

নিউজ ডেস্ক :: চিকিৎসা বিজ্ঞান হলো রোগ উপশমের বিজ্ঞান কলা বা শৈলী। মানব স্বাস্থ্য ভালো রাখার উদ্দেশ্যে রোগ নিরাময় ও প্রতিষেধক বিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিত্য নতুন আবিষ্কার ও প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রতি বছর চিকিৎসা বিজ্ঞান ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো চিকিৎসা বিজ্ঞানেও যোগ হচ্ছ নতুন নতুন আবিষ্কার। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে বিজ্ঞানীরা রাত-দিন পরিশ্রম করছেন। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ছিল চোখে পড়ার মতো। গত দুই বছর করোনার কারণে সেটি আরও বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার ও অগ্রগতি নিয়ে লিখেছেন ডা. রামিশা মালিহা

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে নতুন চিকিৎসা : ম্যালেরিয়া একটি মশাবাহিত রোগ। গত বছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম এ রোগের ভ্যাকসিন অনুমোদন করেছে। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিশ্বে প্রথম একটি ভ্যাকসিন আবিস্কার করা হয়েছে যা ‘মস্কুইরিক্স’ নামে পরিচিত। গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের নতুন ম্যালেরিয়া ভ্যাকসিন বাচ্চাদের ইমিউন সিস্টেমকে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে, যা পাঁচটি ম্যালেরিয়া প্যাথোজেনের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, ৫ থেকে ১৭ মাসের বাচ্চাদের মধ্যে যারা তিনটি পরপর ম্যালেরিয়ার টিকা নিয়েছে এবং সঙ্গে একটি বুস্টার ডোজ নিয়েছে তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়া দ্বারা গুরুতর অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা ৩০ শতাংশ কমে গেছে।

mRNA ভ্যাকসিনের আবিষ্কার টিকাবিদ্যায় নতুন যুগের সূচনা : বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত ৮ বিলিয়নেরও কোভিড-১৯ বেশি টিকা নেওয়া হয়েছে। কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ধরনের mRNA ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে। কোভিড-১৯ এর mRNA ভ্যাকসিনগুলো এখন জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য এবং কোনো গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি ছাড়াই তা কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ম্যাসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিন আমাদের কোষকে এমন একটি প্রোটিন তৈরি করতে নির্দেশ দেয় যা আমাদের দেহের অভ্যন্তরে একটি অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া (ইমিউন রেসপন্স) সৃষ্টি করবে। এ ছাড়াও mRNA ভ্যাকসিনগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, জলাতঙ্ক ভাইরাসের লক্ষণগুলোর বিরুদ্ধে শক্তিশালী অনাক্রম্যতা তৈরি করেছে। এ ভ্যাকসিনের সাম্প্রতিক উন্নতি প্রোটিন অনুবাদ বাড়াতে, সহজাত এবং অভিযোজিত ইমিউনোজেনিসিটি (দেহের কোষগুলোকে একটি ইমিউন প্রতিক্রিয়া করতে উদ্ধৃত করা) সংশোধন করতে কাজ করে।

নতুন অ্যাট-হোম কোভিড টেস্ট : ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিমেস্ট্রশন কোভিড-১৯’র জন্য প্রথম ওভার-দ্য-কাউন্টার (চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ব্যতীত কিনতে পারা যায়) হিসাবে একটি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার জন্য জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন জারি করেছে, যা সম্পূর্ণরূপে বাড়িতে করা সম্ভব। এললুম অ্যাট-হোম কোভিড-১৯ পরীক্ষায় রোগীরা বিশেষজ্ঞের নির্দেশিকা ছাড়াই তাদের নিজস্ব নমুনা সংগ্রহ করে, নমুনাটি প্যাকেজ করে, ল্যাবে পাঠিয়ে দিতে পারবে এবং ফলাফলের জন্য খুব কম সময় অপেক্ষা করতে হবে।

টেলিমেডিসিনে অগ্রগতি : করোনা মহামারি বিশ্বকে চিকিৎসা প্রযুক্তির নতুন আলো দেখিয়েছে। ২০২০ সাল থেকেই টেলিমেডিসিনের ভূমিকা চিকিৎসা প্রযুক্তিতে একটি নতুন বিপ্লবী উন্নয়ন এনেছে। সেটির অগ্রগতি হয়েছে ২০২১ সালে। টেলিমেডিসিনের কারণে মানুষ এখন ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছে। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন, বাধ্যতামূলক সামাজিক দূরত্ব এবং কার্যকর চিকিৎসার অভাব টেলিমেডিসিনকে সংক্রামিত এবং অসংক্রমিত উভয় রোগী এবং চিকিৎসকদের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে পরিচয় দিয়েছে। এই উন্নত প্রযুক্তির ডেটাবেস ব্যবহার করে, সহজেই রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে অগ্রগতি আনতে কপ-২৬ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা : ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত কপ-২৬ জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে ৫০টিরও বেশি দেশ জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক এবং কম কার্বন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ১৪টি দেশ ২০৫০ সালের আগে তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নেট শূন্য কার্বন নির্গমনে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের জন্য তাদের স্বাস্থ্যের যুক্তি দিয়ে একটি উচ্চাভিলাষী ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে কপ-২৬-এ রেকর্ড সংখ্যক স্বাস্থ্য নেতাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। এটাও বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিশেষ একটি অগ্রগতি বলে ধরে নেয়া যায়।

বায়ু দূষণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন নির্দেশিকা : প্রতি বছর, বায়ু দূষণের সংস্পর্শ সাত মিলিয়ন মানুষ অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এর ফলে আরও লক্ষাধিক জীবন নষ্ট হয়। এটি নিরসনে জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নতুন কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছে। নতুন নির্দেশিকাগুলোতে বলা হয়েছে বায়ু দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য কীভাবে ক্ষতি সম্মুখীন হচ্ছে। এসব নির্দেশনা মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নতুন বায়ু মানের স্তর নির্ধারণ করে প্রধান বায়ু দূষণকারীর মাত্রা হ্রাস করে, যার মধ্যে কিছু জলবায়ু পরিবর্তনেও অবদান রাখবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর গুণমান উন্নত করার এ নতুন নীতিমালা ভবিষ্যতে বায়ু দূষণ সম্পর্কিত অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করবে।

তামাকের ব্যবহার আরও হ্রাস : ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তামাক ব্যবহার করা লোকের সংখ্যা ৬৯ মিলিয়ন কমেছে যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশের নিচে। ২০২১ সালে সেটা আরও কমেছে। দুই বছর আগে, মাত্র ৩২টি দেশ ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তামাক ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনার পথে ছিল। এখন ৬০টির বেশি দেশ লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস অর্জনের পথে রয়েছে। এটাও বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বিশেষ অগ্রগতি।

লিভার অসুস্থতায় নতুন গবেষণা : পিত্তনালি লিভারের বর্জ্য নিষ্পত্তি ব্যবস্থা হিসাবে কাজ করে। প্রাপ্তবয়স্কদের এক-তৃতীয়াংশ এবং শিশুদের ৭০ শতাংশ লিভার প্রতিস্থাপনের পিছনে পিত্তনালি দায়ী। এমনকি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের পরেও পিত্তনালির রোগ হতে পারে। প্রতিস্থাপনের পর এক তৃতীয়াংশ রোগীর মধ্যে রোগটি ফিরে আসতে পারে। গত বছর বিজ্ঞানীরা ল্যাবে ‘মিনি বাইল ডাক্ট’ তৈরির একটি নতুন কৌশল আবিষ্কার করেছেন, যা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত লিভারকে সারানো সম্ভব। এই কৃত্রিম বাইল ডাক্টটি দেহের কাজ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করে।

ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন : ‘জোকিনভি’ হলো এফডিএ-অনুমোদিত প্রথম ওষুধ যা হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিন্ড্রোমের মতো বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ‘হাচিনসন-গিলফোর্ড প্রোজেরিয়া সিন্ড্রোম’ অকালবার্ধক্য সৃষ্টি করে এবং দ্রুত আয়ু কমায়। গত বছর নতুন অনুমোদিত এই ওষুধটি আয়ু বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিরল রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে।

ইবোলা চিকিৎসায় অগ্রগতি : গত বছর থেকে ইবোলা চিকিৎসায় একটি নতুন আশার আলো দেখা গিয়েছে। এ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিজ্ঞানীরা মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি তৈরি করেছেন, যা ল্যাব-নির্মিত অণু এবং যা ইমিউন সিস্টেমের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষার অনুকরণ করে। ২০২১ সালে এফডিএ কোভিড-১৯’র জন্য দুটি এবং ইবোলার জন্য একটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি অনুমোদিত করে।

দীর্ঘস্থায়ী ওজন ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি আবিষ্কার : গত বছর এফডিএ নোভো নর্ডিস্কের ওয়েগোভি (জেনেরিক নাম সেমাগ্লুটাইড) অনুমোদন করেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী ওজন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সাপ্তাহিক ইনজেকশন। ওষুধ সেমাগ্লুটাইড-সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে গত বছরই প্রথমবার ‘ট্রাইটারপেনয়েড’ নামে একটি নতুন অ্যান্টিফাঙ্গাল শ্রেণি আবির্ভূত হয়েছে। এটি শরীরের এনজাইমকে বাধা দিয়ে কাজ করে-যা ক্যান্ডিডা ছত্রাকের চারপাশে একটি প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করতে সহায়তা করে। দুই-ট্যাবলেট ফর্মুলেশনের এই অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধটি দ্রুত কাজ করে এবং পুনরায় সংক্রমণ রোধ করতে দুই সপ্তাহের জন্য সিস্টেমে থাকে। একইসঙ্গে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কয়েক দশকের মধ্যে গত বছরই প্রথম নতুন ওষুধ অনুমোদন করেছে (অ্যাডুকানুম্যাব), যেটি শুধু উপসর্গের চিকিৎসা না করে ‘আলঝেইমার রোগের’ অন্তর্নিহিত প্যাথলজিকে মোকাবিলা করতে সক্ষম।

লেখক : রিসার্চ এবং পলিসি ট্রেইনি, সেন্টার ফর রিসার্চ ইনোভেশন এবং ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশন

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি