কিছু কিছু মানুষ সমাজে থাকেন যারা সারা জীবন সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ। তাঁদের এই দায়বদ্ধতা তাঁদের জীবনাচারকে যেন এক ব্রত সাধনায় পরিণত করে। এসব মানুষের চিন্তা ও চেতনার জগত্জুড়ে কেবলই মানুষের কল্যাণ ভাবনা। এরকম একজন ব্যক্তি, যিনি সমষ্টির মঙ্গলচিন্তায় নিজেকে নিমজ্জিত রাখেন, তিনি আবেদ খান। আমার ও অনেকেরই প্রিয় আবেদ খান। সৃষ্টিশীল আবেদ খান আজ পা দিচ্ছেন ৭৬ বছরে।
সাতক্ষীরার খাঁ পরিবার শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই উপমহাদেশের শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত। এই সাতক্ষীরা জেলার রসুলপুরেই আবেদ খানের জন্ম। অবিভক্ত ভারতের ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা আকরম খাঁ সম্পর্কে তার নানা। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৬২ সালে আবেদ খানেরও সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ঘটে দৈনিক জেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে। এই দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে বছরখানেক কাজ করার পর ১৯৬৩ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬৪ সালে
যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। এখানে তিনি পর্যায়ক্রমে শিফট-ইনচার্জ, প্রধান প্রতিবেদক, সহকারী সম্পাদক ও কলামিস্ট হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন কালের কণ্ঠ থেকে পদত্যাগের পর তিনি এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে তিনি এটিএন নিউজ থেকে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি ‘দৈনিক জাগরণ’ পত্রিকার সমপাদক ও প্রকাশক।
আবেদ খান আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তিনি পুরনো ঢাকার নারিন্দা-ওয়ারী অঞ্চলে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি-পর্বের দৃঢ় সূচনা করেন। ২৯ মার্চ তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। জুন মাসে সংবাদ, ডেইলি পিপল, ইত্তেফাক ভবন এবং সারা ঢাকার ওপর বয়ে চলা বিশ্ব-ইতিহাসের সেই অতি-ভয়াল ধ্বংসলীলার চাক্ষুষসাক্ষী হিসেবে তিনি কলকাতার আকাশবাণী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ৮ নম্বর সেক্টরে আবেদ খানের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে মেজর মঞ্জুর এ
সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবেদ খানের সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন সফিকউল্লাহ। এ ছাড়াও জুন মাসে ১২ টি বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় পরিষদ-এর পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন আবেদ খান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের আগস্টে ইত্তেফাকে তাঁর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ওপেন সিক্রেট’ প্রকাশিত হতে থাকে। ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় বিভাগে সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অভাজন ছদ্মনামে ‘নিবেদন ইতি’ শিরোনামে কলাম লেখায় হাত দেন।
ইত্তেফাক থেকে অব্যাহতি নিয়ে কলামিস্ট হিসেবে সমসাময়িক সময়ে দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’, ‘ভোরের কাগজ’ ও ‘সংবাদ’ পত্রিকায় লিখতে থাকেন। ১৯৯৫ সাল থেকে জনকণ্ঠে সম্পাদকীয় পাতায় তাঁর ‘অভাজনের নিবেদন’ প্রকাশের পাশাপাশি প্রথম পাতায় ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকে। ‘গৌড়ানন্দ কবি ভনে শুনে পুণ্যবান’ কলামটি জনকণ্ঠে প্রকাশিত তাঁর স্যাটায়ারধর্মী পাঠকপ্রিয় কলাম। ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ -এর প্রথম পাতায়
তাঁর ‘টক অব দ্য টাউন’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনটি সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তায় দেশবাসীর কাছে হয়ে উঠেছিল যেন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’। একই কাগজে এ সময় তাঁর উপসমপাদকীয় কলাম ‘প্রাঙ্গণে বহিরাঙ্গনে’ প্রকাশিত হতে থাকে। ‘দৈনিক সংবাদ’-এ তিনি ‘তৃতীয় নয়ন’ নামে একটি কলাম ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। ১৯৯৮ সালে নতুন পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলো’-তে ‘কালের কণ্ঠ’ শিরোনামে তাঁর উপসম্পাদকীয় কলাম প্রকাশ শুরু হয়। পরে ২০০৯ সালে আবেদ খানের নেতৃত্বে ‘কালের কণ্ঠ’ নামের একটি দৈনিক পত্রিকা বাজারে আসে।
আশির দশকে আবেদ খান ও ড. সানজিদা আখতার দমপতির গ্রন্থনা-উপস্থাপনায় দম্পতি-বিষয়ক ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘তুমি আর আমি’ বিটিভিতে জনপ্রিয়তা পায়। দম্পতি-শিল্পীদের নিয়ে সঙ্গীত বিষয়ক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘একই বৃন্তে’ সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি একুশে টেলিভিশনের সংবাদ ও চলতি তথ্য বিষয়ের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এর আগে ১৯৯৬-৯৯ সালে তাঁর অনুসন্ধানমূলক টেলিভিশন রিপোর্টিং সিরিজ ‘ঘটনার আড়ালে’ টেলিভিশন-সাংবাদিকতার আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।
অনেক গ্রন্থের প্রণেতা আবেদ খান। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি, অভাজনের নিবেদন, গৌড়ানন্দ কবি ভনে শুনে পুণ্যবান, কালের কণ্ঠ, প্রসঙ্গ রাজনীতি, হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে (গল্প সংকলন), আনলো বয়ে কোন বারতা, বলেই যাবো মনের কথা, গৌড়ানন্দসমগ্র, অনেক কথা বলার আছে, দেশ কি জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্য হবে, ও রাজকন্যে তোমার জন্য, স্বপ্ন এলো সোনার দেশে, আমাদের টুকুনবাবু ইত্যাদি। আবেদ খান সেই বিরল প্রতিভার স্বাপ্নিক মানুষ, যাঁর চোখে স্বপ্ন দেখে আজকের তারুণ্য। আবেদ খান স্বপ্ন দেখেন একটি প্রগতিশীল ও কল্যাণকর বাংলাদেশের। আবেদ খানের সেই স্বপ্নযাত্রার সহযাত্রী আমরাও। শুভ জন্মদিন আবেদ ভাই।
লেখক: সাংবাদিক,