শিক্ষা নগরী রাজশাহীর বাঘা থানা এলাকাধীন আড়ানী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক মেয়র মুক্তার আলীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
পৌর তহবিল থেকে প্রায় সাড়ে ১৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। পৌরসভার টাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ব্যবহার এবং কাগজে-কলমে ভুয়া কর্মচারী নিয়োগ দেখিয়ে এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অস্ত্র, মাদক ও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকা এই সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) দুদকের সমন্বিত রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি বাদী হয়ে দায়ের করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমান। এই মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে মুক্তার আলী নতুন করে আইনি জটিলতায় পড়লেন।
দুদকের দায়ের করা এজাহার ও সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা যায়, মুক্তার আলীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দুটি ভিন্ন কৌশলে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মুক্তার আলীর ব্যবহারের জন্য পৌরসভার নিজস্ব কোনো গাড়ি বা চালক ছিল না। তিনি তার ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের কথা বলে জ্বালানি খরচ পৌর তহবিল থেকে গ্রহণ করতেন। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়ি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করতে হলে পৌর পরিষদকে এবং সরকারকে অবহিত করে অনুমোদন নিতে হয় এবং এর জন্য একটি লগ বই সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু মুক্তার আলী কোনো নিয়মই অনুসরণ করেননি।
তিনি ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৮৬৫ দিন দৈনিক ৭ লিটার করে জ্বালানি তেল ব্যবহারের খরচ দেখিয়েছেন। সে সময়ের বাজারমূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ৯৬ টাকা ১০ পয়সা ধরে মোট ১৩ হাজার ৫৫ লিটার তেলের জন্য ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮৫ টাকা পৌর তহবিল থেকে উত্তোলন করেন। এছাড়াও, কোনো প্রকার বিল-ভাউচার ছাড়াই তিনি জ্বালানি তেল বাবদ অগ্রিম হিসেবে আরও ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪১৫ টাকা গ্রহণ করেন, যা কখনোই সমন্বয় করা হয়নি। এভাবে জ্বালানি তেল বাবদ তিনি মোট ১৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করে আত্মসাৎ করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলায় মুক্তার আলীর বিরুদ্ধে ভুয়া কর্মচারী নিয়োগ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক জানায়, মেয়র থাকাকালে তিনি পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে পাঁচজনকে নিয়োগ দেখান। এই পাঁচজন হলেন—নুরুজ্জামান নাইম, শামীম আহাম্মেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, সঞ্জিব কুমার সাহা ও আবু সাঈদ।
কাগজে-কলমে তাদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৯ হাজার টাকা দেখানো হলেও বাস্তবে এই নামে কোনো কর্মচারী পৌরসভায় কর্মরত ছিলেন না। সম্পূর্ণ ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে তাদের নামে নিয়মিত বেতন-ভাতা তোলা হতো। এভাবে তিনি সর্বমোট ৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পৌর তহবিল থেকে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন।
এবিষয়ে দুদকের সমন্বিত রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আমির হোসাইন দৈনিক বাংলার জাগরনের প্রতিনিধি কে জানান
“সাবেক মেয়র মুক্তার আলীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে সত্যতা পাওয়ায় মামলা দায়েরের জন্য কমিশন থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে পৌর তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, যা দ-বিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মামলা দুটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতে উপস্থাপন করা হবে।”
উল্লেখ্য, মুক্তার আলী ২০২১ সালের জুলাই মাসে একজন কলেজশিক্ষককে মারধরের মামলায় গ্রেপ্তার হন। পরে পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গুলি, মাদক এবং প্রায় এক কোটি টাকা উদ্ধার করে। এই ঘটনায় অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা হলে তাকে মেয়র পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনারও অভিযোগ রয়েছে।