বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম থাকে, যেগুলো উচ্চারিত হলেই একটি সময়, একটি মানসিক আবহ এবং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একটি নাম। তিনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির চার দশকের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর প্রয়াণে তাই কেবল একজন মানুষের জীবনাবসান হয়নি. অবসান ঘটেছে একটি যুগের, যার মধ্যে ছিল আশা ও হতাশা, গণতন্ত্র ও সংঘাত, আন্দোলন ও দমন সবকিছুই।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এর ভোরে তাঁর মৃত্যুসংবাদ যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি আর দশটা মৃত্যুসংবাদের মতো ছিল না। সেটি ছিল বহু মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতির এক আকস্মিক সমাপ্তি। হাসপাতালের শয্যায় নিঃশব্দে থেমে যাওয়া সেই জীবন যেন বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের উচ্চস্বরে চলা বাকযুদ্ধ, রাজপথের উত্তেজনা, নির্বাচনের প্রতীক্ষা ও বর্জনের ইতিহাসকে হঠাৎ স্তব্ধ করে দিল।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক উত্থানের গল্প নয়। এটি ছিল ইতিহাসের চাপ, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সম্মিলিত পরিণতি। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে একজন গৃহিণী থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসা এই নারী বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান নেন। দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি ছিল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
১৯৯১ সালে তিনি যখন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন সেটি কেবল একটি নির্বাচনী বিজয় ছিল না। সেটি ছিল সামরিক শাসনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক। একজন নারী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব সেই সময়ের বাংলাদেশে কেবল রাজনৈতিক নয়, সামাজিক মনস্তত্ত্বেও একটি বড় পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছিল। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিশেষণটি যুক্ত হয়েছে, তা হলো আপসহীন। এই শব্দটি তাঁকে যেমন তাঁর সমর্থকদের চোখে দৃঢ়, সাহসী ও আপস না করা নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি সমালোচকদের কাছে তাঁকে করেছে অনমনীয় ও রাজনৈতিকভাবে কঠোর।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপস বরাবরই একটি বিতর্কিত ধারণা। কখনও এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়েছে, আবার কখনও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বাস্তবতা হিসেবে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন দেখায়, তিনি প্রায় সবসময় আপসের চেয়ে অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন, রাজপথের সংঘাত সবখানেই তিনি নিজের জায়গায় অনড় থেকেছেন। এই অনমনীয়তা একদিকে তাঁকে একটি শক্ত রাজনৈতিক প্রতীক বানিয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতার বহু সুযোগকেও সংকুচিত করেছে এ প্রশ্ন ইতিহাসের বিচারে আজও উন্মুক্ত।
খালেদা জিয়ার শাসনামল কোনো একরৈখিক সাফল্যের গল্প নয়। শিক্ষা ও সামাজিক খাতে কিছু অগ্রগতির আলোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি জোট রাজনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক সহিংসতার স্মৃতিও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে তাই জটিল বলেই চিহ্নিত করেছে। তবু এটাও অস্বীকার করা যায় না, তাঁর সময়েই বাংলাদেশে বহুদলীয় রাজনীতির কাঠামো তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান ছিল। ক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির মধ্যে পালাবদলের সংস্কৃতি ভালোমন্দসহ তাঁর সময়েই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল বেদনাদায়ক ও করুণ। দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা, এরপর গুরুতর অসুস্থতা এই সময়টিতে তিনি কার্যত রাজনীতির বাইরে ছিলেন। তাঁর সমর্থকেরা এসব মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখেছেন, আর রাষ্ট্রীয় বয়ানে এগুলো ছিল আইনি প্রক্রিয়া।
এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা যেখানে বিচার ও রাজনীতি প্রায়শই একে অন্যের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থ শরীর ও কারাবাসের ছবি রাষ্ট্র ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে।
খালেদা জিয়া বিএনপির কাছে কেবল একজন চেয়ারপারসন ছিলেন না তিনি ছিলেন প্রতীক, শেষ আশ্রয়, চূড়ান্ত বৈধতার উৎস। তাঁর নামেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো, তাঁর নীরব সম্মতিতেই রাজনীতি চলত। তাঁর মৃত্যু বিএনপিকে এক গভীর পরিচয় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে দলটি কি ব্যক্তি-নির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারবে? নাকি খালেদা জিয়ার স্মৃতি ও আবেগই দীর্ঘদিন দলটির রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত সত্য আছে জীবিত অবস্থায় যাঁদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক, মৃত্যুর পর তাঁদের নিয়েই সবচেয়ে সংযত ভাষা ব্যবহার করা হয়। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বক্তব্যেও সেই সংযম লক্ষ করা গেছে।
মৃত্যু একজন নেতাকে দলীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইতিহাসের চরিত্রে রূপান্তরিত করে। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটছে। জীবিত অবস্থায় যাঁকে নিয়ে ছিল তীব্র বিরোধিতা, মৃত্যুর পর তিনি হয়ে উঠছেন জাতীয় স্মৃতির অংশ। খালেদা জিয়াকে ভালোবেসেছেন এমন মানুষ যেমন আছেন, তেমনি তাঁর রাজনীতিতে ক্ষুব্ধ মানুষও আছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুসংবাদে যে চোখের পানি ঝরেছে, তা কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের নয়। তা ছিল দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি কণ্ঠ, একটি উপস্থিতি হারানোর শোক।
এই চোখের পানিতে মিশে আছে আন্দোলনের দিন, ভোটের লাইন, টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ, রাজপথের উত্তেজনা একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক স্মৃতি। খালেদা জিয়া আমাদের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন রেখে গেছেন। বাংলাদেশ কি এবার ব্যক্তি-নির্ভর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?গণতন্ত্র কি প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতার পথে হাঁটবে? বিরোধিতা কি দমনের নয়, বিতর্কের জায়গা পাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি দিয়ে যাননি। হয়তো ইতিহাসও তাৎক্ষণিক উত্তর দেবে না। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্র ব্যক্তি দিয়ে শুরু হলেও, টিকে থাকে প্রতিষ্ঠানে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ইতিহাসের নায়কও, বিতর্কের কেন্দ্রও। তাঁকে শুধু প্রশংসা বা শুধু বিরোধিতার চোখে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁকে দেখতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান পতনের সম্পূর্ণ ক্যানভাসে। তিনি চলে গেছেন। কিন্তু রেখে গেছেন এক শূন্যতা যা শুধু একজন মানুষের অনুপস্থিতি নয়, একটি যুগের নীরবতা।
এই নীরবতার মধ্যেই হয়তো বাংলাদেশ নতুন করে ভাববে রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, নেতৃত্ব কাকে বলে, আর গণতন্ত্রের মূল্য কতটা গভীর।আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করছি জান্নাতের উচ্চ মাকামে তাকে স্থান দিয়ে সম্মানিত করার দোয়া করছি। আর আমাদের দেশটাকে দেশে বিদেশি ষড়যন্ত্র থেকে কুদরতিয়াতে হেফাজত করে. এই দেশের মানুষ ভাগ্যের পরিবর্তন করার এমন একটি মানুষকে আল্লাহতালা কবুল করেন দেশ মাটি ও মানুষের কথা বলার সেই রকম একটি যোগ্য ব্যক্তিকে আমাদের দেশ রাষ্ট্রপ্রধান বসিয়ে দেন। এই দোয়াই মহান রবের কাছে প্রার্থনা করছি আমিন।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথার