বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতা, জনসচেতনতার অভাব এবং নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত প্রাণীগুলোর একটি হলো মেছো বিড়াল ( Prionailurus viverrinus )—যাকে ভুল ধারণা ও আতঙ্কের কারণে মানুষের সহিংসতা ও নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে বারবার। মানুষের অজ্ঞতা ও ভয়ের ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিনির্ভর প্রাণীটি বছরের পর বছর ধরে নিগৃহীত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় উদ্যোগে মেছো বিড়াল সংরক্ষণে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো মেছো বিড়ালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে। পূর্বে যেখানে এই প্রাণীটি জাতীয় নীতিনির্ধারণের আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেখানে বর্তমান সময়ে মেছো বিড়াল সংরক্ষণকে জলাভূমি সংরক্ষণ, মানুষ–বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সুরক্ষা) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ মেছো বিড়ালকে সংরক্ষিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রজাতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মেছো বিড়াল হত্যা, ধরাধরা, বিষ প্রয়োগ, ফাঁদ পাতা কিংবা যেকোনো ধরনের ক্ষতিসাধন গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং এ অপরাধকে জামিন অযোগ্য (Non-bailable offence) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। এটি মেছো বিড়াল সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অগ্রগতি।
মেছো বিড়াল বাংলাদেশের জলাভূমি ও কৃষিভিত্তিক প্রতিবেশে খাদ্যশৃঙ্খল ও কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বাস্তবতা সামনে রেখে সরকার জনসচেতনতা বৃদ্ধির দিকেও জোর দিয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে বিশ্ব মেছো বিড়াল দিবস উদযাপন করা হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই দিবসটি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংরক্ষণকর্মীদের অংশগ্রহণে মেছো বিড়ালকে ‘ক্ষতিকর প্রাণী’ থেকে ‘প্রকৃতি ও কৃষির বন্ধু’ হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে সহায়ক হয়েছে।
সরকারের নির্দেশনায় বাংলাদেশ বন বিভাগকে মেছো বিড়াল সংরক্ষণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানুষ–মেছো বিড়াল দ্বন্দ্ব মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং উদ্ধার, পুনর্বাসন ও নিরাপদভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে মেছো বিড়াল হত্যা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় মানুষ–বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্বের গুরুত্ব, মেছো বিড়ালের আইনগত সুরক্ষা এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রথমবারের মতো মেছো বিড়াল হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা দেশের সংরক্ষণ ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে, যেখানে মানুষ–মেছো বিড়াল দ্বন্দ্ব তুলনামূলক বেশি, সেখানে সরকারের উদ্যোগে ক্যারাভেন ভ্যানের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় ভাষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মেছো বিড়ালের ভূমিকা, আইনগত সুরক্ষা এবং দ্বন্দ্ব এড়ানোর উপায় তুলে ধরায় এই উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে এবং পাঠ্যসূচিতে মেছো বিড়ালসহ বিপন্ন বন্যপ্রাণী বিষয়ে তথ্য অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের পহেলা বৈশাখে মেছো বিড়ালের প্রতিকৃতি ও সংরক্ষণ বার্তাসংবলিত শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছে।
সরকারের এক বছরের ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে মানুষ–মেছো বিড়াল দ্বন্দ্বে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় সরকারি উদ্যোগের কারণে মেছো বিড়ালের মৃত্যুহার এবং মানুষ–মেছো বিড়াল দ্বন্দ্ব প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহনশীলতা বেড়েছে এবং সংঘর্ষের পরিবর্তে উদ্ধার ও অবমুক্তকরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নজির তৈরি হওয়ায় বন্যপ্রাণী হত্যার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতিও ভাঙতে শুরু করেছে।
মেছো বিড়াল সংরক্ষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগ ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণ করে—সঠিক সদিচ্ছা, সুপরিকল্পিত কর্মসূচি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, জনসম্পৃক্ততা এবং নীতিগত অগ্রাধিকার থাকলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্ভব। মেছো বিড়াল সংরক্ষণ শুধু একটি প্রজাতি রক্ষার বিষয় নয়; এটি জলাভূমি সংরক্ষণ, কৃষি অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের টেকসই ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি সমন্বিত প্রয়াস।
লেখক: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদ ও গবেষক, বাংলাদেশ।