ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রাণঘাতী হামলায় বহু শিশু শিক্ষার্থী হতাহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। খোদ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের তদন্তেই উঠে এসেছে, এ হামলার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীই দায়ী।
তবে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি এবং তারা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। দুজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
রয়টার্স এই তদন্ত সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। তদন্তে ঠিক কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, কোন ধরনের অস্ত্র বা গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল, কারা এর পেছনে ছিল কিংবা কেন যুক্তরাষ্ট্র স্কুলটিতে হামলা চালিয়ে থাকতে পারে—সেসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদেনে বলা হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার স্বীকার করেছেন— তাদের সামরিক বাহিনী এই ঘটনাটি তদন্ত করছে। কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন কোনো তথ্য বা প্রমাণ সামনে আসতে পারে যা যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দোষ প্রমাণ করবে এবং অন্য কোনো পক্ষকে দায়ী করবে—এমন সম্ভাবনাও তারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তদন্ত আরও কতদিন চলবে বা চূড়ান্ত মূল্যায়নের আগে তদন্তকারীরা আর কী ধরনের তথ্য খুঁজছেন, তা স্পষ্ট নয়।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের বালিকা বিদ্যালয়টিতে গত শনিবার হামলা চালানো হয়, যা ছিল ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা হামলার প্রথম দিন।
জেনেভায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরাইনি জানান, এই হামলায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে এই নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি।
পেন্টাগন রয়টার্সের প্রশ্নগুলো মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, ‘যেহেতু ঘটনাটি তদন্তাধীন, তাই এখন মন্তব্য করা অনুচিত হবে।’
হোয়াইট হাউস সরাসরি তদন্তের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুদ্ধ বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করছে ঠিকই, তবে মনে রাখতে হবে যে ইরান সরকারই বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়।’
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আমরা কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করি না।’ অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই জেনেশুনে একটি স্কুলে হামলা করবে না।
রয়টার্স বলছে, ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী ভৌগোলিকভাবে এবং লক্ষ্যবস্তুর ধরন অনুযায়ী তাদের হামলাগুলো ভাগ করে নিয়েছিল। সূত্রমতে, ইসরায়েল যখন পশ্চিম ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তখন দক্ষিণ ইরানে নৌ-ঘাঁটি ও অন্যান্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এই হামলার জন্য সুনির্দিষ্ট কাউকে দায়ী না করলেও মঙ্গলবার একটি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। মুখপাত্র রভিনা শামদাসানি বলেন, ‘যারা এই হামলা চালিয়েছে, তাদের ওপরই তদন্তের দায়ভার বর্তায়।’
মঙ্গলবার ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিহত ছাত্রীদের জানাজার দৃশ্য প্রচার করা হয়। ইরানি পতাকায় মোড়ানো ছোট কফিনগুলো ট্রাক থেকে নামিয়ে বিশাল জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়ে কবরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, কোনো স্কুল, হাসপাতাল বা যেকোনো বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। যদি এই হামলায় মার্কিন ভূমিকা নিশ্চিত হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের মার্কিন সংশ্লিষ্টতা থাকা সংঘাতগুলোর মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হবে।