মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি :
১১ মে ২০২৬ শিবালয়ের পাটুরিয়া ঘাটে পরিবহণ থেকে চাঁদাবাজি চলছে এবং আরো ব্যাপক প্রস্ততি চলছে চাদাবাজী করার জন্য এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবহণ পরিচালনার জন্য পাটুরিয়া ঘাটে দু’টি কমিটি থাকা সত্তেও মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে মালিক-শ্রমিক সমিতি’র নামে আরো ৩টি কমিটি’র অনুমোদন দিয়েছে জেলা কমিটি। স্থানিয়ভাবে কমিটি আনার প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে চাদাবাজি করার জন্য। সব মিলিয়ে ঘাটে কমিটি হয়েছে পাচটি। পাটুরিয়া ঘাটে পরিবহণ থেকে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে রাতারাতি এসব সংগঠণ গড়ে উঠছে বলে বাস-মালিক শ্রমিকরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ঘাটের কর্তৃত্ব নিতেও মরিয়া হয়ে উঠেছে এসব সংগঠণের নেতারা। এ নিয়ে ঘাটে চলছে চরম উত্তেজনা। যে কোন সময় অপৃতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা। এর প্রতিকার চেয়ে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ করেছেন মানিকগঞ্জ জেলা বাস,কোচ,মিনিবাস ও মাইক্রোবাস মালিক সমিতি এবং মানিকগঞ্জ জেলা বাস,কোচ,মিনিবাস ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়ন।
কয়েকদিন যাবত পাটুরিয়া ঘাট ঘুরে জানা গেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পট পরিবর্তনের পর পাটুরিয়া ঘাটে পরিবহণ থেকে মোটা অংকের চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ায় মালিক-শ্রমিকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর আবারও ফ্যাসিষ্ট সময়ের ন্যায় চাঁদাবাজির পায়তারা শুরু হয়েছে। ফলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চিন্তার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে চাদাবাজদের অপতৎপরতা।
ঢাকা-আরিচা-পাটুরিয়া মহাসড়কে চলাচলকারী সকল পরিবহণ পরিচালনার জন্য মানিকগঞ্জ জেলা বাস,কোচ,মিনিবাস ও মাইক্রোবাস মালিক সমিতি (রেজি:নং ৫৪৯৭) এবং মানিকগঞ্জ জেলা বাস,কোচ,মিনিবাস ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়ন (রেজি নং: ৬১৮০) শিবালয় উপজেলার শাখার দু’টি কমিটি রয়েছে। শ্রম দপ্তর কর্তৃক রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত সংগঠণ ও ট্রেড ইউনিয়ন। একমাত্র শ্রম মন্ত্রণালয় উক্ত মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন প্রদান করে থাকেন বলে বাস-মালিক শ্রমিকরা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের ২টি কমিটি থাকা সত্ত্বেও মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে আরো ৩’টি কমিটি’র আত্মাপ্রকাশ ঘটেছে পাটুরিয়া ও শিবালয়ে। এর মধ্যে গত ৮ এপ্রিল মানিকগঞ্জ জেলা বাস,মিনিবাস,মাইক্রোবাস মালিক সমিতি (রেজি:নং-৪৬৪৪) এর সভাপতি মো.আব্দুর রাজ্জাক লিটন,সাধারণ সম্পাদক পীর বাবুল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৫ সদস্য বিশিষ্ট শিবালয় উপজেলা শাখার আরেকটি মালিক সমিতি কমিটি’র অনুমতি দেয়া হয়েছে। একই তারিখে উক্ত জেলা কমিটি’র সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত মানিকগঞ্জ জেলা বাস,মিনিবাস,মাইক্রোবাস,অটো,টেম্পু অনার্স গ্রুপ (রেজি: নং-ঞঙ-৭৭৮/১১) নামে শিবালয় উপজেলা শাখা কমিটি’র অনুমোদন দেয়া হয়েছে।এই দু’টি সংগঠণের নেতারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতা নিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে সেলফি পরিবহণসহ বিভিন্ন বাস থেকে চাঁদা তোলার পায়তারা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংগঠণ দুইটির রেজিষ্ট্রেশন প্রদান করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যারা শুধু ব্যবসা সংক্রান্ত কাজের জন্য রেজিষ্ট্রেশন প্রদান করে থাকেন তারাই পরিবহন পরিচালনার কমিটি দিচ্ছে। যা একেবারেই নতুন বলে জানা গেছে। অনার্স গ্রুপের গঠণতন্ত্র অনুযায়ী এরকম সংগঠন তারা করতে পারে না। এছাড়াও মহাসড়কে অটো,টেম্পোসহ যে কোন থ্রি-হুইলার চলাচলে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
মানিকগঞ্জ জেলা বাস,মিনিবাস,কোচ,সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, মানিকগঞ্জ (রেজি:নং-৪৫৬২) এই কমিটি’র প্যাডে গত ১৮ এপ্রিল শিবালয় উপজেলা বাস,মিনিবাস,কোচ,সিএনজি পরিচালনার জন্য শ্রমিক ইউনিয়ন শাখা কমিটি নামের ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি কমিটি’র অনুমোদন দিয়েছে মানিকগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো.রাজা মিয়া। ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি’র একজনেরও শ্রমিকের পরিচয় পত্র নেই বলে জানা গেছে।
তাছাড়া হাইওয়েতে সিএনজি চালাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেওয়া হয়েছে পরিচালনা কমিটি।এ কমিটি’র নেতাকর্মীরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাটুরিয়া ঘাটের পরিবহণ থেকে চাঁদাবাজিসহ কর্তৃত্ত নিতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ নিয়ে পাটুরিয়া ঘাট এলাকাতে একটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।ফলে এসব গ্রুপের মধ্যে যে কোন সময় সংঘর্ষের আশংকা করছেন স্থানিয়রা।
বর্তমান সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য একটি কুচক্রীমহল পরিবহণ থেকে অবৈধভাবেব চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছে।শিবালয় উপজেলা অনার্স গ্রুপের সভাপতি মো.ফারুক হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান সুমন এদের বাস বা মিনিবাস না থাকলেও এরা নেতা হয়েছে। শুধুমাত্র পরিবহণ থেকে চাঁদাবাজির জন্য ভুয়া অনার্স গ্রুপের নেতা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাস মালিক-শ্রমিকরা। বাস মালিক-শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-আরিচা-পাটুরিয়া মহাসড়কে প্রতিদিন সেলফি সাড়ে ৪শ’টি, নীলাচল ১শ’ ২০টি, পদ্মা লাইনের ৩০টি এবং যাত্রীসেবা পরিবহনের ২০টি বাস চলাচল করে থাকে।
বর্তমানে সেলফি পরিবহনের বাস থেকে জিপির নামে প্রতিদিন সাড়ে ৩শ’ টাকা, নীলাচল বাস থেকে ২শ’ টাকা, পদ্মালাইন থেকে ১শ’ টাকা এবং যাত্রীসেবা পরিবহণ থেকে ২শ’ টাকা করে চাঁদা তুলছেন ঘাট সংশ্লিষ্ট বাসের সুপারভাইজাররা। ঈদ পার্বনে এসব চাঁদার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। চাঁদা না দিলে সিরিয়াল দেয়া বন্ধসহ নানাবিধ ঝক্কি-ঝামেলায় পড়তে হয় তাদেরক। এ নিয়ে বাস মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেলফি পরিবহণের একাধিক মালিক-শ্রমিক জানান, পাটুরিয়া ঘাটে ৩৫০ টাকা করে চাঁদা না দিলে গাড়ির সিরিয়াল দেওয়া হয় না। ফলে রাস্তায় যাত্রী নিয়ে গাড়ি নামাতে চাঁদা দিতে হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না বলেও জানান তারা। ঈদের সময় সেলফি পরিবহনের চাঁদা বেড়ে বাস প্রতি ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পযর্ন্ত হয়।
নীলাচল বাসের মালিকরা জানান, বর্তমানে নীলাচলের পরিচালনার দায়ীত্বে রয়েছে সুজন ও সাইফুল নামের দু’জন।এরা প্রতিদিন প্রতিটি বাস থেকে জিপির নামে ২শ’ টাকা করে চাঁদা নিচ্ছে। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই গাড়ির সিরিয়াল দেয়া হয়না। বাস মালিকরা জানান, এমনিতেই তেল সংকটের কারণে মাঝে মধ্যেই বাস চলাচল বন্ধ থাকছে। আবার তেলের দাম বাড়নো হয়েছে। সবমিলেয়ে পরিবহণ ব্যবসার খুবই খারাপ অবস্থা চলছে। এরপর যদি এভাবে চাঁদা দিতে হয় তাহলে তো আমাদের পরিবহণ ব্যবসা বাদ দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নাই।
এসব বিষয়ে শিবালয় হাইওয়ে থানার ওসি মোঃ হারুনুর রশিদ বলেছেন,পাটুরিয়ায় পরিবহনগুলো যাতে বেশী ভাড়া না নিতে পারে আমরা সেদিকে লক্ষ রাখছি। চাদাবাজীর বিষয়ে পরিবহনগুলোর নিজস্ব সমিতি আছে তারা ভালো বলতে পারবে। একই বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বিপিএম বলেছেন, ঘাটে কেও কোন রকম চাদাবাজী করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনানুগ ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। আমাদেরকে তথ্য প্রমানসহ কেউ জানালে আমরা ব্যাবস্থা নিবো।