অমর গুপ্ত, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি :
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে চলতি ইরি-বোরো মৌসুমের পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটাই-মাড়াই। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষক। সরকারিভাবে ক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ধান প্রতিকেজি ৩৬ টাকা। তবে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ২৪ থেকে ২৮ টাকায়। উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এবং ধানের দাম কম হওয়ায় লোকসানে পড়েছেন চাষিরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, অধিকাংশ চালকলমালিকের গুদামে আমদানি করা (এলসি) চালের মজুত থাকায় নতুন ধান কেনার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না মিলাররা। ফলে বাজারে ধানের দাম বাড়ছে না বরং বৈরী আবহাওয়ার কারণে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি বিভাগের দাবি, এবার ফলন ভালো হয়েছে; তবে মাঠের কৃষকদের ভাষ্য, অনিয়মিত আবহাওয়া, রোগবালাই ও অতিরিক্ত খরচের কারণে ফলন আশানুরূপ হয়নি। উপরন্তু বাজারে দাম কম থাকায় প্রতি বিঘায় ২-৬ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের অসামঞ্জস্যে কৃষকের ঘরে নতুন ধান উঠলেও স্বস্তি ফিরছে না।
এদিকে প্রাণ গ্রæপের বঙ্গ মিলার্স লিমিটেডের ফুলবাড়ী রাঙ্গামাটিস্থ ফেক্টরীর উদ্যোগে সাধারণ চাষী এবং নিবন্ধিত চাষিদের কাছ থেকে এখনো বোরো ধান ক্রয় শুরু হয়নি। মাঠের ভুক্তভোগী কৃষকেরা বলছেন, প্রাণ কোম্পানী ধান কেনা শুরু করলে বাজারে তার প্রভাব পড়তো এবং কৃষকরা একটু হলেও ভালো দাম পেতো। কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন সামনে সপ্তাহ অথবা পরের সপ্তাহে ধান কেনা শুরু হতে পারে।
উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব নারায়ণপুর আদিবাসীপাড়ার কৃষক ইলিয়াস হেম্ব্রম বলেন, ‘বর্গা নিয়ে চার বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ ধান চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় বীজ, জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক, ধান কাটাসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪০০ টাকা। বর্গা যোগ করে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা। তার হিসাব মতে বিঘাপ্রতি ৩৫ মণ ফলন পেলেও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে খরচই উঠছে না। প্রতি বিঘায় ২ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখন ঋণ শোধ নিয়েই চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আলাদীপুর ইউনিয়নের উত্তর রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক মহিদুল ইসলাম, আলাদিপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য তারাপদ রায়, শিবনগর ইউনিয়নের বর্গাচাষি সুবাস রায় ও পলিশিবনগর গ্রামের ইউসুফ আলী। উপরের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সহমত পোষণ করে তারা বলেন, প্রতি বিঘায় চিকন জাতের ধান ৩২ থেকে ৩৫ মণ পাওয়া গেলেও বিক্রি করতে গেলে দাম পাওয়া যাচ্ছে কম।
পাঠকপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন ১১ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। কিন্তু এবার প্রতি বিঘায় গত বছররে তুলনায় ৩-৪ মণ ধান কম উৎপাদন হয়েছে। অন্যদিকে বাজারে দামও কম। এতে দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়েছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘খরচ বাড়ছে, ফলন কমছে, আবার বাজারেও দাম নেই। কৃষক যাবে কোথায় আর টিকবে কীভাবে?’
উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের সেনড়া এলাকার ধান ব্যবসায়ী সৈয়দ খাদেমুল ইসলাম ধানের দাম হওয়া সম্পর্কে বলেন, ‘মোটা ধান ৭৫ কেজি ওজনের প্রতিবস্তা ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা, বিআর-২৮ জাতের প্রতিবস্তা ১৮৫০ থেকে ১৯০০ টাকা, চিকন (মিনিকেট) ২০৫০ থেকে ২১০০ টাকা এবং ৯০ জিরা জাতের ৩৪৫০ থেকে ৩৫০০ টাকায় কেনা হচ্ছে।’
ধানের দাম কম হওয়ার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মোকাম থেকে এর বেশি দামে ধান নিচ্ছে না বলেই স্থানীয়ভাবে ধানের দাম বাড়ছে না। তবে আবহাওয়া খারাপ হলে দাম আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, উপজেলায় ১৪ হাজার ১৮৬ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ধরা হয়েছে ৯৫ গাহার ৭৬০ মেট্রিক টন ধান।
ফলন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এবার প্রতি বিঘায় ৩৪ থেকে ৩৫ মণ ফলন হয়েছে। ধান কাটতে স্থানীয় ৩৫টি ও বাইরে থেকে আসা ১৫০টি হারভেস্টর মেশিন কাজ করছে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা দ্রæত ধান ঘরে তুলছেন।