ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ভুট্টা চাষিরা। মৌসুমের শুরুতে ভুট্টার ফলন ও দাম ভালো পেলেও টানা বৃষ্টিপাতসহ বৈরী আবহাওয়ার কারণে এখন খেতের ভুট্টার ফলন যেমন কমে গেছে, আর সময় মতো শুকাতে না পারায় ভুট্টার মান ও দামও দুই-ই কমে গেছে। এতে ভুট্টার উৎপাদন খরচ উঠানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলার শিবনগর, এলুয়ারি, আলাদিপুর, খয়েরবাড়ী, দৌলতপুর ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ভুট্টা চাষ হয়েছে। মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু শেষ সময়ে এসে টানা বৃষ্টিপাতাসহ বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের সোনালী স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে গেছে।
এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর ভুট্টার ফলন ভালো হওয়া এবং প্রথম দিকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় খেতের ভুট্টা তুলে সেটি ছড়িয়ে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করে আশানুরূপ দাম পেয়েছেন। কিন্তু কিন্তু শেষ সময়ে এসে টানা বৃষ্টিপাতাসহ বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাঠ থেকে ভুট্টা সংগ্রহ করে ঘরে তোলা হলেও রোদ না থাকায় তা শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভুট্টার দানায় ছত্রাক দেখা দিচ্ছে, কোথাও কোথাও অঙ্কুরোদগমও শুরু হয়েছে। খোলা জায়গায় রাখা ভুট্টা বারবার বৃষ্টিতে ভিজে আরও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ভুট্টার মান ও দাম কমে গেছে।
উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের ভুট্টা চাষি মো. ইউসুফ আলী বলেন, তিনি ২০ বিঘা (১৯ শতকে বিঘা) জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা করে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রথমদিকে প্রতি বিঘা জমিতে ভুট্টার ফলন পাওয়া গেছে ৬০ থেকে ৬৫ মণ। একই সাথে দামও পাওয়া গেছে ৮০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ১হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত। গত কিছুদিন থেকে শিলাবৃষ্টিপাত ও ঝড়োবৃষ্টিতে ভুট্টা খেতে পানি জমে যাওয়া এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে খেতের ভুট্টা তুলতে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে ভুট্টার মান ও ফলন কমে যাওয়াসহ বাজারে দামও কমে গেছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা (৮০ কেজি ওজনের) ভুট্টা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। প্রতি বস্তা ভুট্টায় ৪০০ টাকা কমে গেছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে লোকসানের মুখে পড়েছেন।
উপজেলার নূরপুর গ্রামের কৃষক হোসেন আলী বলেন, এ বছর তিনি ১০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করে প্রথম দিকে ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় আশার আলো দেখেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ার জন্য খেতের সময় মতো খেতের ভুট্টা তোলা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। এ কারণে ভুট্টার ফলনও কমে গেছে। আর বাড়ীতে তোলা ভুট্টা রোদের অভাবে শুকাতে না পেরে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, আবার ভুট্টা গজিয়েও যাচ্ছে।
গোপালপুর এলাকার কৃষক মো. বাদল, সাইফুল ইসলাম, গঙ্গাপ্রসাদ এলাকার কৃষক মো. আলম, গণি মন্ডল, আব্দুস সালাম, জাফরপুর গ্রামের জোবায়দুর রহমান বলেন, বাড়তি মজুরি দিয়ে খেতের ভুট্টা ভেঙে এনে স্তূপ করে রেখেছেন নিজ নিজ বাড়ীতে, কিন্তু রোদ না থাকায় সেগুলো ছড়াতে এবং শুকাতে পারছেন না। এভাবে আর কয়েকদিন থাকলে পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যাবে। এতে তারা তাদের উৎপাদন খরচ টুকুও উঠাতে পারবেন না।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে ক্ষতি কমানো যায়। ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছের ভুট্টা দ্রুত সংগ্রহ এবং পরিপক্ব গাছের ক্ষেত্রে আবহাওয়া অনুক‚লে এলে সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভুট্টার মোচার নিচে গাছ মুচড়িয়ে দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে, যাতে বৃষ্টির পানি জমে দানা নষ্ট না করে। যারা ইতোমধ্যে ভুট্টা সংগ্রহ করেছেন, তাদের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের নিচে নামিয়ে সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, চলতে মৌসুমে ৪ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ভুট্টা চাষাবাদ করা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন। ক্ষতি এড়াতে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।