ইতিহাস শুধুই ধুলোবালি জমা পুরনো কিছু সন-তারিখ আর রাজা-বাদশাদের নাম মুখস্থ করার নাম নয়, ইতিহাস হলো আমাদের বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আসল চাবিকাঠি একজন মানুষ কে, তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কোত্থেকে এসেছে-তা জানতে ইতিহাস পাঠের কোনো বিকল্প নেই। নিজের জাতিগত পরিচয় এবং শিকড়কে গভীরভাবে চিনতে সাহায্য করে এই ইতিহাস।
ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা: ইতিহাস হলো মানবজাতির অভিজ্ঞতার খাতা। অতীতে করা ভুলগুলো থেকে
শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো সম্ভব। যে জাতি তার ইতিহাস জানে না, সে জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। অতীতের আলোতেই গড়ে উঠে আমাদের আগামী। ইতিহাস আমাদের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার বিকাশ ঘটায় এবং মানুষকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রেরণা জোগায়।
অতীতের মহান ঐতিহ্য ও আদর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অতীতের মহান ঐতিহ্য ও আদর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে কোনো জাতি আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কেবল অতীত স্মরণ নয়, এটি হলো ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণা!
ইসলামের ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা: ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের নাম নয়, এটি একটি সুদীর্ঘ কালজয়ী সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং জীবনব্যবস্থার ইতিহাস। তাই ইসলামের ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইসলামের ইতিহাস পাঠের প্রধান ও মূল দিকগুলো হলো: কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন, কুরআনের অনেক আয়াত এবং মহানবী (সা.)-এর হাদিস অবতীর্ণ বা উচ্চারিত হয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যাকে শানে নুযূল বা অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট বলা হয়। ইসলামের ইতিহাস না জানলে ধর্মীয় বিধান ও নির্দেশনার মূল চেতনা ও গভীরতা অনুধাবন করা কঠিন।
আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সামাজিক সুবিচারের শিক্ষা: খোলাফায়ে রাশেদীনের (চার খলিফা) শাসনকাল আমাদের শেখায় কীভাবে ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবাধিকার এবং দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করতে হয়। বিশেষ করে অমুসলিমদের অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তার যে দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছিলেন, তা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার জন্যও অনুকরণীয়।
ইসলামিক স্বর্ণযুগ ও আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে যে ইসলামিক স্বর্ণযুগ বিদ্যমান ছিল, তার ইতিহাস আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায়। চিকিৎসাশাস্ত্রে ইবনে সিনা, গণিতে আল-খাওয়ারিজমি, কিংবা দর্শনে ইবনে রুশদের অবদান ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতি চিন্তা করা অসম্ভব।
কুসংস্কার ও অপব্যাখ্যা রোধ: ঐতিহাসিক সত্য জানা থাকলে ইসলামের নামে প্রচলিত নানা অপব্যাখ্যা, চরমপন্থা কিংবা বিভ্রান্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা সম্ভব হয়। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পাঠ একজন মানুষকে অন্ধ অনুকরণ থেকে বের করে নিরপেক্ষ ও সুচিন্তিত দৃষ্টিভঙ্গি দান করতে পারে। বর্তমানে আমাদের ইসলাম বিমুখতার অন্যতম কারণ হলো ইতিহাস না জানা, ঔপনিবেশিক বা কলোনিয়াল শক্তিগুলো ভৌগোলিক পরাধীনতার চেয়ে বড় আঘাত হেনেছিল আমাদের আত্মপরিচয়ের ওপর। তারা এমন এক শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা রেখে গেছে, যা আমাদের নিজের মূল থেকে বিচ্ছিন্ন করে শোষকদের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে 'শ্রেষ্ঠ' ভাবতে শেখায়। কিন্তু আমরা কেন আজও এই অদৃশ্য শৃঙ্খলে আটকে আছি? এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের নিজস্ব ইতিহাস না জানা। ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাই আমাদের মানসিক দাসত্বে টিকিয়ে রেখেছে, আর এই ফাঁদ থেকে বের হতে না পারলে সত্যিকার স্বাধীনতা কখনোই
সম্ভব নয়! যেহেতু আমরা জানি না যে, একসময় আমাদের পূর্বপুরুষরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সামাজিক ইনসাফ এবং স্থাপত্যে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের 'অনগ্রসর' মনে করি এবং পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ শুরু করি। বিজিত গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ইতিহাস তৈরি করেছিল, যেখানে কলোনিয়াল শাসনকে 'সভ্য করার মিশন' হিসেবে দেখানো হয়। ইতিহাস না জানার কারণে আমরা তাদের শেখানো সেই ভুল বয়ানকেই সত্য বলে মেনে নিই।
নিজস্ব মনীষী ও চিন্তাবিদদের অবদান না জানার ফলে তরুণ সমাজের মধ্যে হীনমন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আধুনিকতা মানেই ইউরোপীয় বা পশ্চিমা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা।
এখন আমাদের করনীয় হলো, কলোনিয়াল চশমা খুলে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পড়া। প্রথম ও প্রধান কাজ হলো ইতিহাসকে নতুন করে জানা। ইংরেজ বা বিদেশি গবেষকদের লিখে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে আমাদের নিজেদের অতীত, সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠভাবে পড়া ও পড়ানো। মনে রাখতে হবে 'অন্যের পোশাক বা ভাষা ধার করে শুধু গোলামী ও দাসত্বই করা যায় কখনও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা যায় না। বস্তুত ইতিহাস না জানা জাতি হলো সেই গাছের মতো, যার কোনো মূল বা শিকড় নেই, সামান্য ঝোড়ো হাওয়ায় তা উপড়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক মানসিকতার চূড়ান্ত পতন ঘটাতে হলে আগে আমাদের নিজেদের শিকড় অর্থাৎ প্রকৃত ইতিহাসকে চিনতে হবে। ইতিহাসকে যখন আমরা সঠিক আয়নায় দেখতে শিখব, তখনই আমাদের স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা