আবদুল মান্নান চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জাতীয় পরিচয়পত্রে ১০ বছর বয়স কমিয়ে ডিগ্রি কলেজের অফিস সহায়ক পদে চাকরি করছেন মোঃ আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাশিনগর ইউনিয়নের হিলালনগর গ্রামের মরহুম সোনা মিয়ার ছেলে। আবুল কালাম চাকরির পাশাপাশি রাজনীতি ও মাঠি ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় এলাকায় ‘মাঠি খেকো’ হিসেবে পরিচিত। সর্বশেষ হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা চতুর্থ শ্রেণী দেখিয়ে বয়স সংশোধন করলেও চাকরি করছে অষ্টম শ্রেণী পাশ দেখিয়ে। সবক্ষেত্রে জালিয়াতি করেও তাঁর চাকরি বহাল থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে কাশিনগর বিএম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেছেন মোঃ আবুল কালাম। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তিনি জন্ম গ্রহনের করেছেন ২৫ মে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দ। সে অনুযায়ী ২০০৮ সালে করেছেন জাতীয় পরিচয়পত্র। কিন্তু তিনি ১০ বছর বয়স জালিয়াতির করে অষ্টম শ্রেণীর সার্টিফিকেট দেখিয়ে কাশিনগর ডিগ্রি কলেজে অফিস সহায়ক পদে ২০২২ সালে যোগদান করেন। এরপর তিনি ২০২৩ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশোধন করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে উপজেলার কাশিনগর ডিগ্রি কলেজে অফিস সহায়ক পদে প্রথমবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সেখানে আবুল কালামই একমাত্র প্রার্থী থাকায় নিয়োগ কমিটি বিজ্ঞপ্তিটি বাতিল করে।
২০২১ সালে পুনরায় অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সেখানে এ পদের জন্য আবুল কালামসহ তিন ব্যক্তি আবেদন করেন। ২০২২ সালে নিয়োগ কমিটি আবুল কালামকে ওই পদে নিয়োগ প্রদান করেন। অভিযোগ উঠেছে, আবুল কালাম সার্টিফিকেট ও ১০ বছর বয়স জালিয়াতি করে তৎকালিন সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের সুপারিশে অফিস সহায়ক পদে যোগদান করেন। জালিয়াতির তথ্য পেয়ে এ প্রতিবেদক মোঃ আবুল কালামের ভোটার তালিকা সংগ্রহ করেন। সে তথ্য অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ওয়েবসাইট থেকে আবুল কালামের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, আবুল কালামের জন্ম ১৯৭৮ সালের ২৫ মে।
তিনি ২০২৩ সালে ১৯৮৮ সালের ২৫ মে জন্মতারিখ দেখিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করেন। ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, আবুল কালামের জাতীয় পরিচয়পত্রের বয়স সংশোধনের জন্য ২০২২ সালে ১৯ অক্টোবর নোটারী পাবলিক করে অষ্টম শ্রেণী পাশ দেখিয়ে আবেদন করেন। আবেদনটি প্রত্যাখান হওয়ার পর তিনি ২০২৩ সালের ২২ জুন চতুর্থ শ্রেণী পাশ দেখিয়ে কুমিল্লার বিজ্ঞ আদালত থেকে নোটারী পাবলিক করিয়ে আইডি কার্ডের বয়স সংশোধনের জন্য পুনরায় আবেদন করে। এরই মধ্যে ২০২২ সালে মোঃ আবুল কালাম কাশিগর ডিগ্রি কলেজে অফিস সহায়ক পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তাঁর আইডি কার্ডটি সংশোধন হয়ে ১০ বছর বয়স কমানো হয় এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করা হয় চতুর্থ শ্রেণী পাশ। স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, মোঃ আবুল কালাম উপজেলার কাশিনগর বিএম হাইস্কুল থেকে ১৯৯৪ সালে এসএসসি পাশ করেছেন।
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে যার রেজিঃ নং-০৩২৪০০, বিভাগ-মানবিক ও সনদ নং-৫৪০৮৪৩। অথচ একই স্কুল থেকে জন্মসাল ১৯৮৮ উল্লেখ করে তিনি নিজেকে অস্টম শ্রেণী পাশ দেখিয়ে ম্যানুয়েল সার্টিফিকেট দিয়ে কাশিনগর ডিগ্রি কলেজের অফিস সহায়ক পদে যোগদান করেন। এ বিষয়ে কাশিনগর বিএম হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইউনুছের ভাষ্য, মোঃ আবুল কালাম ১৯৯৪ সালের আমাদের স্কুলের মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাশ করেছে। আমি এ স্কুলে যোগদান করেছি এক বছর হয়েছে। এরআগের প্রধান শিক্ষক তাকে অষ্টম শ্রেণীর পাশের সার্টিফিকেট দিয়েছে। বর্তমানে ওই শিক্ষক মৃত।
কাশিনগর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন সেলিম সাংবাদিকদের বলেন, আমি নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব। সেখানে ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন চৌদ্দগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ শিব প্রসাদ দাশ গুপ্ত। তিনিই আবুল কালামের নিয়োগের ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন। আবুল কালামের ১০ বছর বয়স জালিয়াতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সম্পর্কে আমার থেকে শিব প্রসাদ দাশ গুপ্তই ভালো বলতে পারবেন। ডিজির প্রতিনিধি শিব প্রসাদ দাশ গুপ্ত বলেন, আমরা ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে সকল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকি। চাকরি প্রার্থীর কাগজপত্র সত্যতা যাচাই করে থাকেন নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব। আবুল কালামের সার্টিফিকেট ও বয়স জালিয়াতির বিষয়টি সদস্য সচিবই ভালো বলতে পারবেন। আমি শুধু, নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যান্য কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সুপারিশ করেছি। বয়স ও সার্টিফিকেট জালিয়াতির বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন। অভিযুক্ত কাশিনগর ডিগ্রি কলেজের অফিস সহায়ক মোঃ আবুল কালাম বক্তব্য জানতে শনিবার মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। রোববার সকালে কল করে তিনি বলেন, চাকরির প্রয়োজনে বয়স সংশোধন করা হয়েছে। আমার ছেলে আপনার সাথে যোগাযোগ করবে, নিউজ করার দরকার নাই।
তবে প্রতিবেদক তাকে শুধু বক্তব্য জানতেই কল দিয়েছেন বললে তিনি ক্ষেপে বলেন, নিউজ করে কি করবেন করেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা ভিন্নতা দেখানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, এখানে অনেকেই অনিয়ম করে চাকরি করছে। শুধু আমি আ’লীগ করার কারণে একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। তবে চতুর মোঃ আবুল কালাম প্রকৃতপক্ষে এসএসসি পাশ হলেও ২০২২ সালের হলফনামায় অষ্টম শ্রেণী ও ২০২৩ সালের হলফনামায় চতুর্থ শ্রেণী পাশ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করেছে। এছাড়াও তৎকালিন ইউপি চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রেও স্বাক্ষর ও তারিখ জালিয়াতি করেছে আবুল কালাম। এত বড় জালিয়াতি করে অফিস সহায়ক মোঃ আবুল কালামের চাকরি কি চলমান থাকবে?-এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের। শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট সচেতন মহলের দাবি, শিগগিরই বিষয়টি তদন্ত করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক। অসৎ লোক শিক্ষা প্রশাসনের সাথে জড়িত থাকলে অন্যরা সততা শিখতে পারবে না।