লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: বৃষ্টিতে কাদা-পানি, আর বৃষ্টি থামলেই ধুলা-বালুর ধূসর আস্তরণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। এমন বেহাল অবস্থার মধ্যেই হেলে-দুলে চলাচল করছে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দূরপাল্লার বাস, ট্রাকসহ হাজার হাজার যানবাহন। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, যাত্রী ও পরিবহন চালকরা।
এটি ঢাকা-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের লক্ষ্মীপুর অংশের প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়কের বর্তমান চিত্র। সড়কের ঝাঁকুনিতে নাকি বুঝতে হয়—লক্ষ্মীপুরে এসে পড়েছেন! জেলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অনেকটা ব্যঙ্গ করে এমন মন্তব্য করেছেন।
জানা গেছে, নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। ৫৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৯ সালে।
তবে চার লেনের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় পুরোনো দুই লেনের সড়কটির বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বৃষ্টির সময় এসব গর্তে পানি জমে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আবার বৃষ্টি থামলে সড়ক শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে ধুলা-বালু উড়তে থাকে চারদিকে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী লাখো মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব গর্তে পানি জমে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আবার বৃষ্টি থামার পর সড়কে জমে থাকা ধুলা যানবাহন চলাচলের সময় বাতাসে উড়তে থাকে। নির্মাণকাজের সময় নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পানি ছিটানো না হওয়ায় ধুলার মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
সড়কের পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন ধুলার মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। এতে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
বাইক আরোহী যুবক ফয়সাল মাহমুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার চার লেন সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। কিন্তু নির্মাণাধীন সড়কের পাশের দুই লেন সড়কটিই এখন যাত্রী সাধারণের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বড় বড় গর্ত আর ধুলো-বালিতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে, যতবার এ সড়কে চলাচল করবেন, ততবারই যেন গোসল করতে হবে। অন্যদিকে বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, পুরো সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।”
প্রতিদিন লক্ষ্মীপুর থেকে নিজের কর্মস্থল চন্দ্রগঞ্জ কারামতিয়া কামিল মাদরাসায় যাতায়াত করেন সহকারী অধ্যাপক মাওলানা জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, “রাস্তার যে বেহাল অবস্থা, তাতে মনে হচ্ছে এ জেলায় কোনো অভিভাবক নেই। যেখানে লক্ষ্মীপুর থেকে চন্দ্রগঞ্জ যেতে সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট সময় লাগে, সেখানে এখন দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। এ দুর্ভোগের শেষ হওয়া উচিত।”
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি পাঁচটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চার লেন সড়কের প্রস্থ হবে ২০ মিটার।
এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর অংশের প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে দুটি প্যাকেজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৯ কোটি টাকা। চন্দ্রগঞ্জ বাজার থেকে মান্দারী বাজার এলাকা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার চার লেন নির্মাণের কাজ পেয়েছে রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্স। আর মান্দারী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল এলাকা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ পেয়েছে তাহের ব্রাদার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, নোয়াখালী অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে তিনটি প্যাকেজে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছে রিলায়েবল বিল্ডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে একটি প্যাকেজের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের অভিযোগ, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে আগের তুলনায় যাতায়াতে সময় অনেক বেড়েছে। ধীরগতিতে যান চলাচলের কারণে বিভিন্ন রুটে ভাড়াও বেড়েছে। কোথাও কোথাও ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচলকারী দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহন চালকরাও এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এবং ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে। ফলে সড়কটির বেহাল অবস্থার প্রভাব পড়ছে পুরো অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও যাতায়াত ব্যবস্থায়।
স্থানীয়দের দাবি, চার লেন নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো নিয়মিত মেরামত করতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের কারণে সৃষ্ট ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবী বায়েজিদ হোসেন বলেন, “রাস্তাটির এমন দুরবস্থা যে, লক্ষ্মীপুরে আমার মায়ের অপারেশন হওয়ার পর ডাক্তার ছাড়পত্র দিলেও তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারিনি। ডাক্তারকে অনুরোধ করে আরও দুই দিন হাসপাতালে রেখেছিলাম, যাতে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে নিয়ে আসি। তারপরও ভয় ছিল—সড়কের ঝাঁকুনিতে কখন যেন অপারেশনের সেলাই খুলে যায়।”
লক্ষ্মীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান বলেন, “এ সড়কের এমন অবস্থা যে, এ পথে যাতায়াত করলে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর অসুস্থ মানুষ আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার বিষয়টি বলা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই অতিদ্রুত সড়কটি সংস্কারের আওতায় এনে জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবি জানাচ্ছি।”
লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের চার লেনের কাজ চলমান রয়েছে। মূল সড়ক থেকে রাস্তা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কাজ সম্পূর্ণ হলে একটি লেয়ার দেওয়া হবে। এতে দুর্ভোগ অনেকটা কমে আসবে। এখন সবাইকেই একটু কষ্ট করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মূল সড়কের যেখানে যেখানে বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে, সেগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টি ও ভারী যানবাহনের কারণে সংস্কার করা অংশগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। অন্যদিকে কাদা ও বালুর বিষয়ে আমাদের করার কিছু নেই। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ লাঘব করতে চাই।”