
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে রডের পরিবর্তে জিআই তার এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের সত্যতা মিলেছে। কাজ শুরুর পর থেকেই নানা অনিয়মের কথা জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং রাতের আঁধারে নিম্নমানের কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। দিনের আলোতে ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের ওপর মানুষের পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বারবার মৌখিক অভিযোগ দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার পরও কাজের মানে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি। সেতুটির নির্মাণকাজ নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং এর স্থায়ীত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়।
প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট এলাকায় ৪৯ দশমিক শূন্য ছয় মিটার দীর্ঘ এই আরসিসি সেতুর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে। মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছিল, যা মূলত সেনবাগ পৌর আওয়ামী লীগের এক নেতার লাইসেন্সে পরিচালিত হচ্ছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার সরাসরি কাজের মাঠে উপস্থিত না থেকে তার চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে কাজটি করিয়ে আসছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, দিনের বেলা কাজ বন্ধ রেখে রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে স্ল্যাব ও রেলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হতো। ফলে সামান্য চাপেই সেতুটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং এর দুর্বল অবকাঠামো সবার নজরে আসে। স্থানীয়রা এই অনিয়মের প্রতিবাদ জানালে ঠিকাদারের লোকজন তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার গুরুতরতা অনুধাবন করে এলজিইডির নোয়াখালী কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরেজমিনে সেতুটি পরিদর্শন করেন। নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ফুটপাত ও রেলিংয়ের কাজে ব্যাপক ত্রুটি এবং নকশা বহির্ভূত কার্যক্রম দেখতে পান। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতেই ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের স্ল্যাবগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে অপসারণ করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আগামী সাত দিনের মধ্যে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সমস্ত ত্রুটি সংশোধন করে লিখিতভাবে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এই অনিয়মের দায়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এলজিইডির এক প্রকৌশলীকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে উপসহকারী প্রকৌশলী এবং ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট পদমর্যাদার ব্যক্তিরা রয়েছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে কাজের কিছু ত্রুটি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে তা সংশোধন বা ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে এমন গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হচ্ছে।