![]()
প্রযুক্তি ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বা কলড্রপ যেন গ্রাহকদের প্রতিদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় ফোন রিসিভ করার মাত্র তিন থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই সংযোগ কেটে যায় কিংবা কথা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট থাকে। কারওয়ান বাজার, মিরপুর, গাবতলী ও উত্তরার মতো জনবহুল এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, উঁচু ভবন বেড়ে যাওয়া এবং দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে এই সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। জরুরি মুহূর্তে কথা বলতে না পেরে এবং বারবার কল করার কারণে গ্রাহকদের অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একসঙ্গে প্রচুর কল আসায় নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ১৪ কোটি। বিপুল পরিমাণ এই গ্রাহকগোষ্ঠীর বিপরীতে মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত বেতার তরঙ্গ বা স্পেকট্রামের পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল। দেশে প্রতি ১৩ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে মাত্র এক মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গ ব্যবহৃত হয়, অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতি এক মেগাহার্টজ তরঙ্গে মাত্র তিন থেকে চার লাখ গ্রাহককে সেবা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। প্রয়োজনীয় তরঙ্গের এই ঘাটতির কারণেই কলড্রপ, নেটওয়ার্ক জ্যাম এবং মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার মতো নিয়মিত যন্ত্রণার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সংকট নিরসনে সম্প্রতি বিটিআরসি অপারেটরদের অতিরিক্ত লোয়ার-ব্যান্ড তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ভবনের ভেতরে নেটওয়ার্ক কাভারেজ বাড়াতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সেবার মান নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সুফল না পেয়ে অতিষ্ঠ গ্রাহকরা নিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কাছে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের সেবার মান, কলড্রপ ও ইন্টারনেট জটিলতা নিয়ে মোট ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রায় সাড়ে ৬৫ হাজার অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে বলে জানিয়েছে। শুধু সর্বশেষ অর্থবছরেই ১১ হাজারেরও বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে সেবার মান ও ইন্টারনেটের ধীরগতি সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। গ্রাহকরা শর্টকোড, ওয়েববক্স ও ইমেলের মাধ্যমে এই অভিযোগগুলো দাখিল করে থাকেন এবং বিটিআরসি তা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের কাছে ব্যাখ্যা তলব করে থাকে।
বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কলড্রপের সমস্যা কেবল তরঙ্গস্বল্পতার কারণে হয় না, এর পেছনে অপর্যাপ্ত টাওয়ার স্থাপনও একটি বড় কারণ। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৪৬ হাজার মোবাইল টাওয়ার থাকলেও গ্রাহকদের সঠিক সেবা দিতে আরও অন্তত ১৪ হাজার টাওয়ারের প্রয়োজন রয়েছে। তবে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, জটিল প্রশাসনিক অনুমোদন এবং স্থানীয় পর্যায়ে নানা বাধার কারণে ইচ্ছে করলেই দ্রুত নতুন টাওয়ার স্থাপন করা সম্ভব হয় না। কেবল টাওয়ারের সংখ্যা বাড়ালেই এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান মিলবে না, বরং এর পাশাপাশি বেতার তরঙ্গের সুষম বরাদ্দ, ফাইবার অপটিকস সংযোগের উন্নয়ন এবং আধুনিক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি দূর করতে মোবাইল অপারেটরদের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।