
ফিচার ডেস্ক: পশ্চিমা বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী উৎসব হ্যালোউইন এখন বিশ্বায়নের প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ দিনে ছোট থেকে বড় সবাই এই উৎসবে মেতে ওঠে এবং ভূত, পেত্নী কিংবা নিজেদের প্রিয় কোনো সুপারহিরোর পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়। নিছক আনন্দের ছলে এই দিনে নানা ধরনের কস্টিউম পরার চল থাকলেও এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী পুরোনো এক ভৌতিক ইতিহাস। মূলত বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃতির মিশ্রণেই আজকের এই জাদুকরি পোশাক পরিধানের প্রথা গড়ে উঠেছে যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন সেল্টিকদের বিভিন্ন বিশ্বাস।
এই কস্টিউম পরার প্রথার মূল উৎস খুঁজে পাওয়া যায় প্রায় দুই হাজার বছর আগে স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী সেল্টিকদের প্রাচীন সামহেইন উৎসবে। শরৎ ও শীতের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে আয়োজিত এই উৎসবটিকে মূলত অন্ধকার মৌসুমের সূচনা হিসেবে ধরা হতো। সেল্টিকরা বিশ্বাস করতেন যে এই বিশেষ সময়ে জীবন্ত ও মৃত জগতের মধ্যকার অদৃশ্য ব্যবধান অত্যন্ত পাতলা হয়ে যায়, যার ফলে মৃত আত্মারা সহজে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। অশুভ আত্মা বা দেবতারা যেন মানুষের ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য তারা ভুতুড়ে ও ভীতিকর পোশাক বা মুখোশ পরে নিজেদের ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। তাদের ধারণা ছিল, এই ধরনের ছদ্মবেশের মাধ্যমে অশুভ আত্মাদের ভয় দেখিয়ে বা নিজেদের একজন ভেবে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
পরবর্তী সময়ে ইউরোপে মামিং ও গাইজিং নামে আরেকটি প্রথা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে যেখানে সাধারণ মানুষ খড়ের তৈরি বিশেষ পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি গিয়ে গান ও নাটক পরিবেশন করতেন। পরবর্তীকালে স্কটিশ ও আইরিশ অভিবাসীরা এই ঐতিহ্যটি উত্তর আমেরিকায় নিয়ে যান এবং সেখান থেকেই আধুনিক ট্রিক-অর-ট্রিট প্রথার সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকায় হ্যালোউইনের রাতে বিশৃঙ্খলা রোধ করতে এবং শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্য স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রিক-অর-ট্রিট প্রথার প্রচলন করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিনির রেশনিং শেষ হলে এই প্রথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বর্তমান যুগে এটি শিশুদের মিষ্টি সংগ্রহের একটি আনন্দময় খেলায় পরিণত হয়েছে।
উনিশ ও বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত হ্যালোউইনের পোশাকের রূপ একরকম থাকলেও এর সত্যিকারের রমরমা যুগ শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। সে সময় নিউইয়র্কের উদ্যোক্তা বেন ও নাট কুপার ভাইয়েরা কম খরচে জনপ্রিয় পপ-সংস্কৃতির চরিত্রভিত্তিক কস্টিউম তৈরি করে এই ক্ষেত্রে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। বেন কুপার ডট ইন নামের তাদের কোম্পানি কমিক বুক ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় চরিত্রগুলোকে শিশুদের কাছে সহজলভ্য করে তোলে এবং হ্যালোউইনের কস্টিউমকে উৎসবের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত করে। বর্তমানে হ্যালোউইনে কস্টিউম পরার উদ্দেশ্য আনন্দ উপভোগ করা এবং নিজস্ব সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটানো হলেও এটি মূলত প্রাচীন সেল্টিকদের টিকে থাকার লড়াই, ইউরোপীয় লোকসংস্কৃতি ও আধুনিক পপ-কালচারের এক দারুণ মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।