
অর্থনীতি ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির চাহিদায় বিশ্বজুড়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এশিয়ার প্রধান চিপ উৎপাদনকারী দেশগুলোতে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো রপ্তানিমুখী দেশগুলোতে সম্প্রতি উৎপাদন খাত সম্প্রসারিত হলেও আগের মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে। মূলত এআই খাতে করা বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে এখন গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা। দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগব্যয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক ব্যবসায়িক আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো নতুন করে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে, যা দীর্ঘকাল ধরে চিপ ও প্রযুক্তি পণ্যের জোরালো চাহিদার ওপর ভর করে এগিয়ে চলছিল।
টোকিওভিত্তিক দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ তোরু নিশিহামা জানিয়েছেন যে, এতদিন চিপ ও এআই খাতের শক্তিশালী চাহিদা বিশ্ব অর্থনীতির নানা দুর্বল দিককে আড়াল করে রেখেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া এবং জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে সেই ইতিবাচক পরিস্থিতি আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এশিয়ার দেশগুলোর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী রপ্তানিকারক দেশগুলো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, চীনের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানেও কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমের গতি স্পষ্টতই ধীর হয়ে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়ায় গত আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে মন্থর গতিতে কারখানার কার্যক্রম বেড়েছে এবং তাইওয়ানেও উৎপাদন খাতের পিএমআই সূচক আগের তুলনায় নিচে নেমে গেছে।
তবে এশিয়ার সব দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি একই ধারায় চলছে না, বরং কিছু দেশে এর ব্যতিক্রম চিত্রও দেখা গেছে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি রাষ্ট্রে সম্প্রতি কারখানার কার্যক্রম আগের তুলনায় দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর হলেও রপ্তানি আদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং এআই খাতের উত্থানে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংশোধন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সংস্থাটির মতে, আগামী বছরগুলোতে এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমে যেতে পারে, যা এই অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এআই খাতের অতি-প্রত্যাশা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে এবং জানিয়েছে যে দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রযুক্তির অতিউত্থান অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিও বয়ে আনতে পারে। যদি এআই খাতের প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা হঠাৎ বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল প্রযুক্তি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা দ্রুত বৈশ্বিক আর্থিক বাজার এবং সামগ্রিক উৎপাদন খাতে ছড়িয়ে পড়বে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আর্থিক পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারে এবং শেয়ারবাজারে বড় ধরনের মূল্যপতনের ঘটনা ঘটতে পারে। শেষ পর্যন্ত রপ্তানি ও উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে তা জাপানের পাশাপাশি সমগ্র এশিয়ার অর্থনীতিকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।