
নিউজ ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নানা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর জোরালো দাবি জানাবে বাংলাদেশ। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়া শহরে বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১। এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বমঞ্চে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তহবিল প্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তুতির কথা তুলে ধরা হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এই সম্মেলনে দেশের সুনির্দিষ্ট দাবি ও অগ্রাধিকার বিষয়গুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। ওই সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দেশের সামগ্রিক প্রস্তুতি জানাতে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় যে, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এবার সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
পরিবেশমন্ত্রী জানান, তুরস্কের সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই সম্মেলনে উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবেন। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া মানুষের স্বার্থরক্ষা, জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বনেতাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা এবং সার্বিক উন্নয়নকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার কোনো বিকল্প নেই। অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার করার ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেশের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে অনুদান বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু তহবিলে আবেদন ও তা অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়াগুলো সহজ করার বিষয়েও আন্তর্জাতিক মহলে দাবি জানাবে প্রতিনিধিদল।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয়, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তা চাইবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর এলাকা, চর এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হবে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকা হারানোর মতো অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন এবং অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে উন্নত দেশগুলোকে প্রধান নির্গমনকারী রাষ্ট্র হিসেবে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হবে। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও জ্বালানি খাতের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা চেয়ে জোরালো অবস্থান নেবে বাংলাদেশ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীল শিল্পে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও দেশের অগ্রাধিকারে রয়েছে। এছাড়া বনভূমি, ম্যানগ্রোভ বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রকৃতিনির্ভর সমাধানে অর্থায়ন বাড়ানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে বাংলাদেশ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ড. সাইমুম পারভেজ জানান যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দেশের বিশিষ্ট জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত অবস্থানপত্র তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট, জি-৭৭ এবং সমমনা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে দেশের প্রতিনিধিদল। কপ-৩১ সম্মেলন থেকে জলবায়ু অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সহায়তার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হবে এবং এর মাধ্যমে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষিত হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।