বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ অপরাহ্ন
স্বাস্থ্য ডেস্ক: ওজন কমানোর লক্ষ্যে অনেকেই কঠোর ডায়েট কিংবা শরীরচর্চা শুরু করলেও কিছুদিন পর হঠাৎ করেই সব উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। ওজন মাপার যন্ত্রে আশানুরূপ ফল না দেখলে মনে হতে থাকে যে এত পরিশ্রম বুঝি পুরোটাই বৃথা যাচ্ছে। অনেকে তখন হতাশ হয়ে ভাবেন যে এত কষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। সাধারণ মানুষের ধারণা, ওজন না কমার জন্য কেবল অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস কিংবা শারীরিক অলসতাই দায়ী। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় আসল ভূমিকা পালন করে আমাদের মস্তিষ্ক। কঠোর বা কড়াকড়ি ডায়েট শুরু করলে মস্তিষ্ক এটিকে নিজেদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে ধরে নেয়। এর ফলে শরীর নিজেই ওজন কমানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে শুরু করে। বিবর্তনের ধারা এবং মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু জৈবিক প্রক্রিয়ার কারণেই মূলত এমনটি ঘটে থাকে।
আমাদের মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে হাবেনুলা নামের একটি অংশ। এটি মূলত মস্তিষ্কে ডোপামিন বা সন্তুষ্টির হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এবং একে মস্তিষ্কের প্রেরণা বা মোটিভেশন সুইচ বলা চলে। কোনো ব্যক্তি যখন কড়া নিয়মের বেড়াজালে বন্দि হয়ে অতিরিক্ত ক্যালরি বা ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন এবং কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পান না, তখন মস্তিষ্কের লেটারাল হাবেনুলা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে ডোপামিনের মাত্রা কমে যায় এবং ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট কাজের প্রতি আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। একবার ডায়েটে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে এই হাবেনুলা ভবিষ্যতে আর চেষ্টা না করার জন্য নেতিবাচক সংকেত পাঠাতে শুরু করে। যার ফলে শুরু হয় বারবার ওজন কমানো এবং তা পুনরায় বেড়ে যাওয়ার অস্বস্তিকর এক চক্র।
মানব মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট ওজন বা সেট পয়েন্ট নির্ধারিত থাকে, যা মস্তিষ্ক সব সময় রক্ষা করতে চায়। রক্তে লেপটিন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে মস্তিষ্ক শরীরকে বেশি খাবার গ্রহণের জন্য প্ররোচিত করে। প্রাচীনকালে আদিম মানবদেহের চর্বি বা ফ্যাট সংরক্ষণ করা ছিল জীবন বাঁচানোর প্রধান উপায়। সেল সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক মানুষের মস্তিষ্ক তার আগের সর্বোচ্চ ওজনটি স্মরণে রাখে। ফলে ডায়েট করে ওজন কমানোর পর শরীর যেকোনো উপায়ে সেই পূর্বের ভারী ওজনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। সাইকোলজি টুডে এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ওজন কমানো কেবল মানসিক শক্তি বা ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয়, এটি মূলত একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া। তাই মস্তিষ্ককে ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অভ্যাস গড়ে তুলতে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুট করে ওজন কমানোর ক্র্যাশ ডায়েটের পেছনে না ছুটে সার্বিক সুস্থতা নিশ্চিত করে এমন জীবনধারা বেছে নেওয়া উচিত। পর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং নিয়মিত হাঁটাচলার মতো শারীরিক পরিশ্রম হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে। এ ছাড়া শৈশব থেকেই খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরন ভবিষ্যৎ মেদ জমানোর প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে থাকে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি মস্তিষ্ক, জিন ও পরিবেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি শারীরবৃত্তীয় অবস্থা। স্নায়ুবিজ্ঞান ও ফার্মাকোলজির ক্রমাগত অগ্রগতি এখন চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। তাই ওজন কমানোর লড়াইয়ে ব্যর্থ হলে হতাশ না হয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে টেকসই অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া উচিত।