মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন

চাঁচড়ার রেণু পোনা খাত কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা

যশোর প্রতিনিধি :: দেশি ও বিদেশী সকল জাতের মাছের রেনুর হ্যাচারিজ উৎপাদন ও পোনা মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত যশোর। এখানকার হ্যাচারি গুলোতে আগে শুধু মাত্র দেশি প্রজাতির রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, পাঙাশ, আফ্রিকান মাগুর ও কয়েকটি কার্প জাতীয় মাছের রেনু বা পোনা উৎপাদন হোত। কিন্ত এখন দেশি কৈ, শিং, মাগুর, চিতল, ফলই, বাটা মাছের রেনু উৎপাদন হচ্ছে হ্যাচারিতে। এখানে পাওয়া যায়, পাবদা, গুলশা, চিতল গ্রাসককার্প, মিরর কার্প, পাঙাশ, জাপানি পুঁটি, হেলিকপ্টার ফিশ পোনা বা রেনু। ছোট আয়তনের পুকুরেও এখানে বানিজ্যিক আধুনিক পদ্ধতিতে পোনা বা রেনু নার্সিং হয়। এই কৃষি খাতে থেকেও আর্থিক স্বাবলম্বী হয়েছেন এই খাতের মালিক-কর্মচারি ও সংশ্লিষ্টরা।

মাছের সাথে সাথে আত্মপ্রকাশ হয়েছে নতুন নতুন খাতের। এসব খাতে সংশ্লিষ্টরাও জীবিকা নির্বাহ করে বেশ আছেন। মাছের প্রবাদ পুরুষ চাঁচড়া সব্জীবাগের গুরু মহসিন মাষ্টারের হাত ধরে আশির দশকে শুরু হলেও ২০০০ সালের পর থেকে চাঁচড়ার এসব মৎস্য হ্যাচারিতে দেশি ও বিদেশি জাতের মাছের পোনা উৎপাদন ও মাছ চাষে বিপ্লব ঘটে। এই মৎস্য বিপ্লবে কর্ম সংস্থান হয়েছে লাখ লাখ মানুষের।

বেকারত্ব যেমন ঘুচেছে তেমনি পাশাপাশি মৎস্য খাত অবদান রাখছে সার্বিক জাতীয় অর্থনীতিতে। এই খাতের কারনে যশোরে নয় মাস থাকে প্রাণ চাঞ্চল্য আর বাকি তিন মাস হৈ চৈ কমে যায়। এক বিঘা আয়তনের একটি সাদা মাঠা ছোট্ট পুকুর থেকে লাখ লাখ টাকার বানিজ্য হয়। প্রতি মাসে রেনু বা পোনা মাছের একটি চালান ওঠে এসব পুকুর থেকে। এখন আর কোন পুকুর পড়ে থাকেনা। জেলার প্রায় ৯৮ ভাগ ছোট বড় পুকুর এখন বানিজ্যিক মৎস্য উৎপাদনের আওতায়।

জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানায়, আশির দশকে যশোরে মাছের রেণু উৎপাদনের বিস্তার ঘটে। যশোর জেলায় ১৩,৬২৬ হেক্টর জলায়তন বিশিষ্ট পুকুর ও ১৩,৯৩১ হেক্টর বাঁওড় রয়েছে। হ্যাচারি গুলোতে উৎপাদিত রেণু পোনা এসব জলাশায়ে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ।

বিশেষ করে যশোর শহরের চাঁচড়াসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠে ৮৭টি হ্যাচারি। রুই, কাতলা, থাই পাঙাশ, শিং, কই, মাগুর, সিলভার কার্প, কালবাউশ, মিরর কার্প, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সাত থেকে আট হাজার কেজি রেণু পোনা উৎপাদন করা হয়। মাসে মোট উৎপাদন হয় ২৮ থেকে ৩২ হাজার কেজি রেণু পোনা। রয়েছে পৃথক মূল্য। একেক মাছের একেক মূল্য। এছাড়া দেশের একটি বৃহত্তর অংশের মাছ চাষিদের জীবিকা নির্বাহ হয় এ উৎপাদিত রেণু পোনা খাত থেকে। এসব হ্যাচারি উৎপাদিত রেণু পোনা দেশের মোট চাহিদার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পূরণ করে বলে দাবি জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও স্বল্প পরিসরে এলসির মাধ্যমে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েও ভারতে রপ্তানি হচ্ছে যশোরের এই রেণু পোনা। কিন্তু বর্তমানে হ্যাচারি মালিকরা চরম প্রতিক‚লতার সম্মুখীনের মধ্যে দিনপার করছেন। ব্রুড স্বল্পতা, পুকুর লিজ, মাছের খাবার, বিদ্যুৎসহ সংশিষ্ট সব কিছুর দাম বাড়ায় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এতে করে স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। সেই সঙ্গে করোনার প্রভাবে বিপর্যয়ের মুখে রেণু পোনা উৎপাদন। এ অবস্থায় মৎস্য বিভাগের উৎসাহে লোকসানের ঝুঁকি নিয়ে উৎপাদন করছে হ্যাচারিগুলো। তবে এমন অবস্থায় মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা চাষীদের সমস্যা সমাধানে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছে।

চাঁচড়া মোড় সব্জীবাগ, যশোর বাসটার্মিনাল সড়কের বাবলাতলায় দুধারে স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের ক্রেতাদের সমাগমে প্রতিদিনই প্রাণ চঞ্চ হয়ে ওঠে। ভোর হতে না-হতেই চাঁচড়া চেকপোস্ট মোড় থেকে বিশাল এলাকাজুড়ে সড়কের দুই ধারে প্রচুর সংখ্যক ট্রাক, পিকআপ, ইঞ্জিনচালিত নছিমন, আলমসাধু প্রভৃতি গাড়ি এসে মাছ বোঝাইয়ের অপেক্ষায় থাকে। এসব গাড়িতে করেই কাছে-দূরের গন্তব্যে রেণু পোনা নিয়ে যান ব্যাপারীরা। এ বাজার বসে প্রতিদিন ভোর থেকে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোনা বিক্রির হাটও শেষ হয়ে যায়। প্রতিদিন এ বাজারে কোটি কোটি টাকার মাছের পোনা বেচা-কেনা হয়। বরিশাল, মাদারিপুর, ফরিদপুর, নড়াইল, খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানের উদ্দেশ্যে পোনা মাছের গাড়ি লোড হয় এসব এলাকা থেকে। এই খাতে সংশ্লিষ্ট পিক আপ, ট্রাক, ছোট ট্রাক, ভ্যান, নসিমনের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। রয়েছে মৎস্য খাদ্য, জাল, হাড়ি, দাড়িপাল্লা, খুচরা চায়ের টি স্টল, হোটেল, মুদি ব্যবসা, অক্সিজেন, পলিব্যাগ বিক্রয় কেন্দ্র। চাঁচড়া, বলাডাঙা, কাজিপুর, পুলেরহাট, ভাতুড়িয়া, সাড়াপোলে মাছ চাষ কেন্দ্রিক প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। হাজারোর্ধ ছোট বড় হোটেল ও টি স্টলে থাকে সদা কর্ম চাঞ্চল্য। শুধুমাত্র চাঁচড়া বাজার কেন্দ্রিক দুই লাখ মানুষ মৎস্য খাতে সম্পৃক্ত। এদের জীবন যাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনে তাকে অর্থনৈতিক বিপ্লবের আওতায় এনেছে এই মৎস্য খাত। চাঁচড়া বাজার ২৪ ঘন্টা জমজমাটের কারনই এই মৎসখাত। জাল পার্টির যাতায়াত পয়েন্ট এটি। অবশ্য জেলে পাড়া যার আরেক নাম বর্মণপাড়ায়ও এখন দুটি স্পট তৈরি হয়েছে যাকে ছোটখাট বাজার বলা যায়। হুদা দারোগার মোড়েও কয়েকটি প্রতিষ্টান রয়েছে যা মৎস্য খাতের উপর ভিত্তি করেই চলে।

রেণু পোনা চাষী ও ব্যবসায়িরা বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে রেণু পোনার জন্য যশোর বিখ্যাত। দেশের চাহিদার সব ধরনের মাছের প্রায় ৬০/৭০ শতাংশ মাছের পোনা এ জায়গা থেকে সরবারাহ করা হয়। মোবাইল অর্ডারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেণু অর্ডার দিলে পরিবহনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়াও হয়। বিভিন্ন পোনা বা রেনু মাছের সহজলভ্যতা, জনপ্রিয় ও মানের দিক দিয়ে যশোরের মাছের পোনার সুনাম রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।

হ্যাচারি মালিকরা বলেন, বর্তমানে মাছের রেণু পোনা উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। রেণুপোনা বাজারে ধস নেমে যাওয়ায় চাষিরা হতাশগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে পুকুরে যে পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা হয় তার বেশির ভাগ উঠছে না। অবশ্য করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতির কারনে মাঝে দুই বছর মাছ ব্যবসায় অস্থিরতা ছিল যথেষ্ট। এখন আর তা নেই। বলা যায় একটা ধকল কাটিয়েছে যশোরের পোনা ও রেনু মার্কেট। যদিও এই ধকল প্রাপ্তির তুলনায় খুবই নগণ্য। কেনা জানে মৎস্য খাতের প্রবাদ পুরুষ হাজী মহসিন মাষ্টার, মাছ চাষী সাইফুজ্জামান মজু, ফিরোজ খান, শওকত, শামছুর রহমান, বলাডাঙা কাজিপুরের আলী, আলহাজ্ব মহিউদ্দীন, বাহা উদ্দীন, পিয়ারু, নিমাই, আনোয়ার বাঙাল, আনু, ওয়াহিদ সেকেন্দার লুলু, হক মোস্তফা, জাহাঙ্গীর, জাহিদুর গোলদার, রবিউল ইসলাম রবি, শঙ্করপুরের জালাল, আমিনুরের মত লক্ষ মানুষ এখানে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত মাছ চাষী। ডালমিল সব্জীবাগের হ্যাচারি মালিকরা জানান, সকল হ্যাচারিতে বিগত তিন বছর ধরে পোনা উৎপাদন কিছুটা কম। একই সময়ে পোনা উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে।

প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বেশ কটি হ্যাচারি বন্ধ হয়ে গেছে। এসব হ্যাচারি আর্থিক সমস্যায় ভূগছে। সরকার যদি হ্যাচারি মালিকদের বাঁচাতে চায়, তাহলে নিয়মিত ঋণ দিতে হবে। অবশ্য এরা স্বীকার করেন, করোনার

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি