সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন
দেশের প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার যোগেন্দ্রনগর গ্রামের বাসিন্দা আব্বাস প্রামাণিক দীর্ঘ জীবনের পরিক্রমায় ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে আছেন। ভোটার পরিচয়পত্র অনুযায়ী ১৯০৩ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রবীণ ব্যক্তি ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নিজের চোখে দেখেছেন। কর্মজীবনে তিনি খুবজীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সে সময় তার মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬০ টাকা। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি এলাকার কোমলমতি শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পবিত্র কোরআন শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি মৃত সদর উদ্দিনের সন্তান এবং তার সংসারে দুই মেয়ে ও ছয় ছেলে রয়েছে। দীর্ঘ এই জীবনে তার স্ত্রী অনেক আগেই মারা গেছেন এবং তার সমসাময়িক কোনো মানুষই আজ আর বেঁচে নেই।
বয়সের ভারে প্রবীণ এই মানুষটির শরীর এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং চলাচলের সময় তাকে সবসময় লাঠির ওপর ভরসা করতে হয়। এছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি কানেও কিছুটা কম শোনেন এবং শত বছরের অনেক পুরনো স্মৃতি এখন তার আর ঠিকমতো মনেও থাকে না। তবে এসবের মাঝেও সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১২৩ বছর বয়সেও তিনি কোনো ধরনের চশমা ব্যবহার না করেই নিয়মিত নামাজ আদায় করেন এবং পবিত্র কোরআন শরিফ পড়েন। তার দৃষ্টিশক্তি এখনো এতটাই স্বাভাবিক যে, তার চেয়ে বয়সে ৩০ থেকে ৪০ বছরের ছোট ব্যক্তিরাও যেখানে খালি চোখে পড়তে সমস্যায় পড়েন, সেখানে তিনি দিব্যি সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পান। সবসময় হাতে একটি ক্যাসিও ঘড়ি পরিধান করা এই মানুষটি এখনো ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলেন এবং সাধ্যমতো নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করেন।
খাবারের ক্ষেত্রে তার পছন্দের তালিকায় রয়েছে সাধারণ ও পুষ্টিকর কিছু উপাদান যেমন বাতাসা, খাঁটি গরুর দুধ ও মসুর ডাল। একসময়ের বিত্তশালী এই মানুষটি বর্তমানে একটি ভাঙাচোরা ঘরে দিন কাটাচ্ছেন এবং তার সন্তানরা সবাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নাতি-নাতনিরাই মূলত নিজেদের সাধ্যমতো তার দেখাশোনা করেন। তার নাতি শফিকুল ইসলাম জানান, তার দাদা সবসময় খুব ধার্মিক ও সৎ জীবনযাপন করেছেন এবং গাড়িতে চড়াকে বিলাসিতা ভেবে বেশিরভাগ সময় হেঁটেই যাতায়াত করতেন। আরেক নাতি বেলাল হোসেন উল্লেখ করেন যে, বয়সের এই পর্যায়ে দাদার পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হলেও সবসময় তা সবসময় জোগাড় করা সম্ভব হয় না। তার মেয়ে আলিমা বেগম জানান, শৈশবেই মাকে হারানোর পর তিনি বাবার স্নেহে বড় হয়েছেন এবং সহজ-সরল এই মানুষটিকে সবসময় সততার পথেই চলতে দেখেছেন।
পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সেবা সংগঠনও এই প্রবীণ নাগরিকের পাশে দাঁড়িয়েছে। তার চলাফেরা সহজ করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির সামনে একটি সিঁড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। গুরুদাসপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ জানান, আব্বাস প্রামাণিক এলাকার অন্যতম প্রবীণ ব্যক্তি এবং তার সুচিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে খুবজীপুর প্রবীণ সেবা কেন্দ্র। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাকে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এই প্রবীণ শিক্ষকের সুস্থতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও শ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে।