সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোট হবে

জুলাই সনদের মূল ভিত্তির আলোকে দেশের সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনের প্রক্রিয়ায় নতুন করে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু ধারা পরিবর্তনে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা বা কার্যকারিতা যে বাতিল হয়নি, সে বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সংস্কার কমিটির সমস্ত কার্যক্রম ও প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে এবং আগামী বছরের প্রথম সংসদীয় অধিবেশনে সুনির্দিষ্ট সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হবে।

এই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকরা সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাদের মধ্যে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি চালুর দাবি জোরালো হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য বজায় রাখা, বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগদানের বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। সম্পাদকরা সতর্ক করে বলেন, সাংবিধানিক পদগুলোতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে অতিতের মতো এসব প্রতিষ্ঠান আবারও চরম দুর্বল ও বিতর্কিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

মতবিনিময় সভায় বিরোধী দলের নিষ্ক্রিয়তা ও কমিটিতে তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেক সাংবাদিক। তারা বলেন, প্রধান বিরোধী দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই ধরনের যুগান্তকারী সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়ায় কিছুটা ঘাটতি থেকে যেতে পারে। তাই পাঁচজন বিরোধী সংসদ সদস্যকে কমিটিতে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ওপর তারা বিশেষ জোর দেন। এছাড়া প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অতীতের সংকট এড়াতে সর্বজনগ্রাহ্য ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করেন। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতিহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধানের পদের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাবও উঠে আসে। নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বর্তমান সংবিধানের অনেক পরিভাষাকে ঔقনিবেশিক মানসিকতাযুক্ত বলে উল্লেখ করেন এবং ‘প্রজাতন্ত্র’ শব্দের পরিবর্তে যথাযথ শব্দ চয়নের পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ ক্ষমতাসীন দলের দূরদর্শিতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যে কোনো দলকে ক্ষমতার বাইরে যেতে হতে পারে—এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই সংবিধান সংশোধন করা উচিত। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রয়োজনে একতরফা উদারতা দেখিয়ে হলেও বিরোধী দলকে সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ওপর মত দেন।

সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ভবিষ্যতে তাদেরও বিরোধী দলের আসনে বসতে হতে পারে—এই গণতান্ত্রিক বাস্তবতা তাদের মানসিকতায় রয়েছে এবং সেটি মাথায় রেখেই সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দল কমিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধি না পাঠালেও, জাতীয় সংসদে যখন এই সংশোধন বিল উত্থাপন করা হবে, তখন তারা অত্যন্ত কার্যকরভাবে আলোচনায় অংশ নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সরকারের এমন উদার ও নমনীয় মনোভাব এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলের গঠনমূলক পরামর্শের ভিত্তিতেই দেশের সর্বোচ্চ আইন সংশোধনের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: