বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন
অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি দমন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিপরীতমুখী লক্ষ্যের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাত দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি ছয় দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক পেরিয়ে গেলেও অর্থনীতির গতি বাড়ানোর সেই প্রত্যাশিত লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, উল্টো ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি সার্বিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সাময়িক প্রবৃদ্ধি চার দশমিক এক চার শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, যা থেকে উত্তরণের জন্য অবশিষ্ট সময়ে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যোগ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এমন বাস্তবতায় দেশের নীতিনির্ধারকেরা এক ধরনের জটিল সংকটের মুখে পড়েছেন কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি পুরোপুরি শিথিল করা হলে পণ্যের দাম আবারও লাগামছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে নীতি কঠোর রাখলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ এবং সামগ্রিক উৎপাদনে গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সূচকগুলোর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত মাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব। ফলে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির এই বিপরীতমুখী চাপের মুখে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বর্তমান সময়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অর্থনীতি পরিচালনা করতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি হ্রাসের জন্য ঋণের খরচ বেশি রাখলে যেমন বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত হয়, তেমনই প্রবৃদ্ধি বাড়াতে দ্রুত সুদহার কমালে বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বেড়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করা ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আগের মতো নয় দশমিক পাঁচ শূন্য শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। মূলত প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি সুদহার কমানোর মতো আর্থিক বাস্তবতা ও সাহস এই মুহূর্তে নীতিনির্ধারকদের নেই।
এদিকে চড়া সুদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধিতে, যা দীর্ঘদিন ধরে পাঁচ শতাংশের নিচেই ঘোরাফেরা করছে। আগস্ট মাসে যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র চার দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ, সেখানে সরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি পৌঁছেছে ছত্রিশ দশমিক চার শূন্য শতাংশে। এর অর্থ হলো ব্যাংকিং খাতের ঋণের বড় অংশই সরকারের কোষাগারে চলে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ বা কারখানা সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা ঋণ ঘোষণা করা হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।