শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন

খবর নেই বিনিয়োগে

অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নতুন শিল্প স্থাপন, বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে প্রত্যাশিত গতি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে সাধারণ মানুষের আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে পাঁচ শতাংশের নিচেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানি কমে গেছে। সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচিতেও বরাদ্দের অর্থ খরচের ক্ষেত্রে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের সর্বশেষ প্রান্তিকভিত্তিক পরিসংখ্যানেও এক ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের অর্থনৈতিক এই স্থবিরতার পেছনে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, চড়া ব্যাংকঋণ সুদ, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের আমলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বাড়ার বড় আশা করলেও আট মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।

বিনিয়োগের এই খরা কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, অতীতের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে সরকার অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও পুঁজিবাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি চার দশমিক সাত পাঁচ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা টানা কয়েক মাস ধরে পাঁচ শতাংশের নিচেই রয়েছে। অন্যদিকে পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে, ব্যাংকগুলোতে সাধারণ মানুষের আমানত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেলেও এবং ঋণের সুদহার সামান্য কমলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়ছে না। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হলে ব্যাংকঋণের সুদের হার আরও অনেক নিচে নামিয়ে আনা জরুরি।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কম। এর ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে একদিকে যেমন উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারের চাহিদাও সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মন্তব্য করেছেন যে, বিনিয়োগের জন্য মূলত পরিবেশ, নিরাপত্তা ও মুনাফার নিশ্চয়তা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তার কিছুই নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতির দেখা মিলছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিকভিত্তিক পরিসংখ্যানে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। যদিও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তবে তা মূলত নতুন কোনো বড় ইক্যুইটি বিনিয়োগ নয়, বরং বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের ফল। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট রুপালী হক চৌধুরী জানান, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যযুদ্ধের অনিশ্চয়তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কারণে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মৌলিক ব্যবসায়িক অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বন্দরের নানা সমস্যার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের নানামুখী দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: