বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৫ পূর্বাহ্ন
মতামত ডেস্ক: গণতন্ত্র রক্ষা ও একে সুসংহত করতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমরা প্রায়ই মৌলিক প্রশ্নটি এড়িয়ে যাই যে আমরা ঠিক কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কেবল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা ঘটলেও এর রূপ বিভিন্ন হতে পারে। একদিকে ক্ষমতা একক দল বা ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি হতে পারে সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র, অন্যদিকে অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্রের জন্ম নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রামটিই হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করা, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের সময় জনগণের আসল কণ্ঠস্বর ও উদ্বেগের সঠিক প্রতিফলন ঘটে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের ধারণাটিকে কেবল প্রতি পাঁচ বছর পরপর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল ঘটানোর মধ্যে সংকুচিত রাখা হয়েছে। এই ন্যূনতম সংজ্ঞাকে পুরোপুরি ভুল বলা না গেলেও, আমাদের মনোযোগ কেবল নির্বাচনের দিনটিতে নিবদ্ধ থাকলে দুই নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে গঠনমূলক কিছু আশা করা অর্থহীন হয়ে পড়ে। এমন ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর ভোট হলেও মধ্যবর্তী সময়ে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে ক্ষমতাসীনদের হাতে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিরোধী দল নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো সুযোগ পায় না, অথচ পাঁচ বছর পর বিশাল ক্ষমতা নিয়ে সরকার গঠনের দৌ্রে নেমে পড়ে।
গণতন্ত্রকে যদি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয় যেখানে রাজনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সরকারি নীতি নির্ধারিত হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি থাকবে, তবেই বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার সুযোগ তৈরি হয়। মূলত একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাজনীতিকে বিজয়ী সব নিয়ে নেয় নীতি থেকে সরিয়ে কিছু জেতো কিছু হারো নীতির ওপর দাঁড় করাতে পারে। তবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না বলে এই রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে মিত্রতা গড়া এবং কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করাই বিরোধী দলের মূল কাজ হওয়া উচিত।
তবে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলোর রাজনীতি এখনো অনেকাংশে সংঘাতকেন্দ্রিক ও জনবিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কেউ কেউ মুখোমুখি সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে পুরোনো কৌশলেই হাঁটছে। আবার কিছু তরুণ রাজনৈতিক দল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে সংস্কার এজেন্ডাকে যুক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে এবং প্রায়ই নীতিগত অবস্থানে অনড় থাকতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি দেশে বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি কেবল সরকার ফেলার ক্ষমতা বা নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না, বরং তা পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার, নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অন্যের অধিকার রক্ষার সৎসাহসের মাধ্যমে।