সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:২১ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এক যুগান্তকারী অধ্যায়। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার, ভোটাধিকার হরণ, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগ—একটি জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই অভ্যুত্থানের পক্ষের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাত দেখা যাচ্ছে, তা জাতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
একটি সফল গণ-আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় লক্ষ্য ও আদর্শে ঐক্য ধরে রাখা। অথচ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান সংশোধন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে শরিক দলগুলোর দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং রাজপথের উত্তেজনা প্রমাণ করছে, দেশের রাজনীতি আবারও অসহিষ্ণুতা ও সংঘাতের পুরোনো ধারায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘জুলাই স্পিরিট’ হারিয়ে গেলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। মতবিরোধ, নীতিগত বিতর্ক কিংবা সরকারের সমালোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই মতভেদ যখন সহিংসতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় রূপ নেয়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক পরিবেশকেই অস্থিতিশীল করে না; বরং পতিত অপশক্তির পুনরুত্থান এবং বহিরাগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগও সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের আস্থার। যে তরুণরা পরিবর্তনের স্বপ্নে রাজপথে নেমেছিল, তারা যদি আবারও বিভক্ত ও সংঘাতমুখী রাজনীতি দেখতে পায়, তবে সেই স্বপ্ন হতাশায় রূপ নেবে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আদর্শ ও কৌশল থাকতে পারে। তবে জুলাইয়ের চেতনা কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জাতির অর্জন। তাই সরকারের দায়িত্ব বিরোধী মতের জন্য গণতান্ত্রিক পরিসর নিশ্চিত করা, আর বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ বজায় রাখা এবং অস্থিতিশীলতার পরিবর্তে গঠনমূলক রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া।
সংঘাত কখনোই সমাধানের পথ নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবেই, কিন্তু তা যেন জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও সুশাসনের আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানাতে হলে বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পথেই এগোতে হবে। তবেই জুলাইয়ের অর্জন টেকসই হবে এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পাবে।