সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৫ অপরাহ্ন

লোকসানের চাপে পোলট্রি খামারি

দেশে সুলভ মূল্যে প্রাণিজ প্রোটিন সরবরাহে পোলট্রি শিল্পের অবদান দীর্ঘদিনের। ডিম ও মুরগির সহজলভ্যতা দেশের পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই শিল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিরা যখন টানা লোকসানের মুখে পড়েন, তখন পুরো খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডিম উৎপাদনে খামারিদের যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

খামারিদের অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা। অথচ তাদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ছয় টাকার মতো দামে। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমেই প্রায় তিন টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। টানা চার মাস ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় অনেক খামারি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কেউ খামার বন্ধ করে দিয়েছেন, কেউ কর্মচারী ছাঁটাই করেছেন, আবার কেউ ঋণের চাপ সামলাতে না পেরে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একসময় কর্মচাঞ্চল্যে ভরা অনেক খামার এখন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কোথাও খালি শেড, কোথাও আবার অল্প কিছু মুরগি নিয়ে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা চলছে। একসময় হাজার হাজার মুরগির খামার পরিচালনা করা অনেক খামারি আজ জীবিকার তাগিদে অন্য কাজ করছেন। এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত দুর্দশার গল্প নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পের দুর্বল হয়ে পড়ার ইঙ্গিতও দেয়।

এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। খামারিরা বলছেন, খামার থেকে ডিম কম দামে বিক্রি করতে হলেও বাজারে সেই ডিম তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য থাকায় প্রকৃত উৎপাদক ন্যায্যমূল্য পান না। একই সঙ্গে মুরগির খাদ্য ও ওষুধের বাজারেও বড় কোম্পানির প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রয়মূল্যে তার প্রতিফলন ঘটছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ছোট ও প্রান্তিক খামারিরা বড় বাণিজ্যিক খামারের তুলনায় দ্রুত সংকটে পড়েন। কারণ তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি এবং তারা সহজে ঋণ বা সরকারি সহায়তা পান না। একবার ক্ষতির মুখে পড়লে আবার উৎপাদনে ফিরে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে ধীরে ধীরে বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়া পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

পোলট্রি খাত ইতোমধ্যে দেশের একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। তাই এই খাতের ভিত্তি হিসেবে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোলট্রি খামারিরা যদি টিকে থাকতে না পারেন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি শিল্প নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে প্রোটিনের অন্যতম উৎসও।

তাই এই সংকটকে সাময়িক বাজার ওঠানামা হিসেবে না দেখে দ্রুত কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সহজ ঋণ ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পোলট্রি খাতের এই সংকট আরও গভীর হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার ওপর।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: