বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১১ পূর্বাহ্ন
দেশে মাদক সমস্যার সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণা এক গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মাদক ব্যবহারকারীদের ৬০ শতাংশের বেশি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসে। অর্থাৎ মাদক এখন আর শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়; এটি কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সরাসরি হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রায় ৮২ লাখ মাদক ব্যবহারকারীর এই বাস্তবতা কেবল সামাজিক নয়, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটও। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—মাদক গ্রহণের শুরু হচ্ছে খুব অল্প বয়সে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বন্ধুবান্ধবের প্রভাবে। কৌতূহল, মানসিক চাপ, পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক অনিশ্চয়তা কিশোরদের মাদকের পথে টেনে নিচ্ছে। এই প্রবণতা সমাজ, পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার দায়কেও স্পষ্ট করে। কিশোর বয়সেই যদি প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে তোলা না যায়, তবে পরবর্তী সময়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গাঁজা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলেও ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও কোডিনজাত কাশি সিরাপের ব্যবহারও কম নয়। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ছে—যা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। ফলে মাদক সমস্যা এখন কেবল নৈতিক বা অপরাধের নয়, বরং এক জটিল জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগের বার্তা রয়েছে। ঢাকা বিভাগে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বাধিক, বরিশালে সর্বনিম্ন। বড় শহর ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক সরবরাহ ও ব্যবহার বেশি—যা আইনশৃঙ্খলা ও নজরদারির ঘাটতির প্রতিফলন। তবে গ্রামাঞ্চলেও মাদক বিস্তার দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ঘাটতি। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের বড় অংশ কখনোই চিকিৎসা নেয় না। যারা নেয়, তাদের অনেকেই পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক সেবা পায় না। ফলে পুনরায় মাদকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। কেবল ধরপাকড় বা শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এই চক্র ভাঙতে পারছে না।
এই বাস্তবতায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। মাদক সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের ইস্যু হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
অন্যথায়, মাদক আসক্তির বয়স কমার এই প্রবণতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও গভীর সামাজিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নিমজ্জিত করবে।