শনিবার, ২৭ Jun ২০২৬, ০৭:০৭ অপরাহ্ন
যেখানে বিস্ময় নেই সেখানে উদ্ভাবন নেই। যেখানে অনুভূতি নেই সেখানে আনন্দও নেই। নবান্নে ধানকাটা ক্ষেতের গর্তে ইঁদুরের ধান লুকিয়ে রাখা, বাড়ির পাশের ডোবায় খড়-কুটোর উপর ডাহুকের ডিম, সুনসান বিলের মধ্যিখানে একলা দাঁড়িয়ে থাকা গা ছমছম হিজল গাছ কিংবা ভাদরের নিস্তরঙ্গ জলে শাপলা ফুলের মাথায় বসে থাকা ধ্যানী ফড়িংটিকে আমার ছেলে দেখেনি।
বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গার মতোন আমার আটপৌরে গরীবের ঘরেও দুটি ভাইবোন ওরা। শরতের শুভ্রকেশ কাশবনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের ঝিকঝিক কিংবা হুইসেল শোনা হয়নি ওদের। ওদের চোখে তাক লাগা কোনো বিস্ময় নেই। বসন্তে কোকিলের বিরহ রোদন, দূর আকাশে ভুবন চিলের ক্রন্দন ওদের কর্ণকুহরে পৌঁছায়না। ওরা যেন সব শুনে ফেলেছে, সব দেখে ফেলেছে মোবাইল স্ক্রল করে করে।
জগদীশ চন্দ্র বসু মোবাইল আবিস্কারের বহু আগেই উদ্ভিদের প্রাণস্পন্দন শুনতে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্র-নজরুল কীবোর্ড, ই-মেইল ছাড়াই মানবতার ম্যাসেজ পৌঁছে দিয়ে গেছেন ঘরে ঘরে। ইউটিউব নয় সেলুলয়েডের ফিতাকে আশ্রয় করেই সত্যজিৎ, ঋত্বিকরা আজো পথিকৃৎ। মুখ দেখে নয় বরং মুখ ঢেকে রেডিও, গ্রামোফোনের পাথর থালায় প্রাণভরা গানের সুর ছড়িয়েই শচীনকর্তা, হেমন্ত, মান্না বাবুরা ইতিহাস। সেলফি নয় হৃদয়ের ক্যানভাসে মনুষ্যজমিনের ছবি এঁকে গেছেন বাংলার বাউল ফকিরেরা।
ধর্মের মর্মবাণী প্রচার করে গেছেন সুফি বৈষ্ণবেরা। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের “পাখি সব করে রব” শোনাতে হোম থিয়েটার অথবা ডিজে বক্সের প্রয়োজন হয়নি। “বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/ মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই?” এমন বিরহ যাতনার ছবি প্রজেকশনে প্রোজেক্টর লাগেনি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর। তাহলে আমাদের ডেভেলপমেন্টের প্রকৃত ল্যাডমার্ক কি? ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাকওয়ার্ড?
সিভিলাইজেশনের এতোসব আয়োজন, আলোকের বিচ্ছুরণ- দূরকে করেছ নিকট বন্ধু পরকে করেছ আপন এমন জিকির তোলা কি ফিকির মাত্র? সো কল্ড সভ্যতার ঢেঁকুর তোলা জেনারেশন নিয়ে আমরা আদপে কোথায় যাচ্ছি? পরিবর্তন অবসম্ভাবি, পরিবর্তন ধ্রুব। তবু স্টিফেন হকিংস কেন বলেন, ‘উন্নত প্রযুক্তিই পৃথিবী ধ্বংস করবে।’