বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

ইঞ্জিনিয়ারিং বায়োলজি: পরিবেশ রক্ষার নতুন হাতিয়ার

একবার ভেবে দেখুন তো, যদি ব্যাকটেরিয়াই হয়ে যায় পৃথিবী বাঁচানোর সুপারহিরো! ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য শোনালেও বিজ্ঞানীরা ঠিক এই দিকেই এগোচ্ছেন।

ইঞ্জিনিয়ারিং বায়োলজি (Engineering Biology) কে সহজভাবে বললে দাঁড়ায় “জীবকে নিজের মতো করে সাজিয়ে পরিবেশের সমস্যা সমাধান করা।” বিজ্ঞানীরা এমন মাইক্রোব (ক্ষুদ্র জীবাণু) তৈরি করছেন যারা নিজেরাই প্লাস্টিক, PFAS (দূষণকারী রাসায়নিক), তেল, ভারী ধাতুুর মতো ভয়ংকর দূষণকারীকে ভেঙে ফেলতে পারে। তাই বর্তমানে অনেক দেশ আর বড় বড় কোম্পানি এখন এই প্রযুক্তিতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে।

কিন্তু বিষয়টা শুধু দূষণ পরিষ্কারের মধ্যে আটকে নেই। CO₂–এর মতো গ্রিনহাউস গ্যাসও কাজে লাগানো যায়। যেটা আমরা সাধারণত ক্ষতিকর ভেবে থাকি, ইঞ্জিনিয়ার করা ব্যাকটেরিয়া ও শেওলা সেই গ্যাসকে বায়োপ্লাস্টিক বা জ্বালানিতে পরিণত করতে পারে। যদিও এখনো এই পদ্ধতিগুলো খুব লাভজনক নয়।

আরেকটা চমৎকার দিক হলো বর্জ্যকে সম্পদে বদলে ফেলা যা থেকে আমরা সুফল পেতে পারি । উদ্ভিদ থেকে পাওয়া চিনিকে ব্যবহার করে এখন রঙ, কাপড়, প্লাস্টিক, এমনকি শিল্প রাসায়নিকও তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি খুবই পরিবেশবান্ধব biosurfactant (প্রাকৃতিক সাবান) বানানো সম্ভব, যা তেল ছড়িয়ে পড়া পরিস্কারের কাজে দুর্দান্ত কার্যকরী। তবে বড় পরিসরে এগুলো সস্তায় তৈরি করা এখনো চ্যালেঞ্জ।

এই পুরো প্রযুক্তি আরও শক্তিশালী হয় যখন AI, সেন্সর, রোবট আর IoT এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ধরুন, কোনো জায়গায় দূষণ হলো, একটা biosensor সঙ্গে সঙ্গে সেটা শনাক্ত করল। সেই তথ্য AI–র কাছে গেল, আর AI হিসাব করে ঠিক করে দিল, “এখন মাইক্রোবদের টক্সিন পরিষ্কার মোডে কাজ করতে হবে।”

রোবট আর স্বয়ংক্রিয় বায়োরিয়্যাক্টর আবার এসব মাইক্রোবকে ঠিকমতো বড় হওয়ার জন্য সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে রাখে, তাপমাত্রা থেকে খাবার পর্যন্ত।

কিন্তু ল্যাব থেকে বাস্তবে পাঠানো এতটা সহজ নয়। বড় স্কেলে উৎপাদন মানেই contamination-এর ভয়, জিন ঠিকমতো স্থির থাকবে কি-না সেই দুশ্চিন্তা, আর পণ্য আলাদা করতেও ঝামেলা আছে। তার সঙ্গে প্রতিটি দেশে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম, কোথাও জিএমও খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, আবার কোথাও কিছুটা শিথিল।

নিরাপত্তা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউই চাইবে না ইঞ্জিনিয়ার্ড করা মাইক্রোব পালিয়ে গিয়ে পরিবেশে সমস্যা তৈরি করুক। তাই kill switch, auxotrophy, genetic firewall, এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এগুলো বড় স্কেলে ঠিকমতো কাজ করানো কঠিন।

এই কারণে বিজ্ঞানীরা এখন মাইক্রোবের মধ্যে জেনেটিক বারকোড লাগাচ্ছেন, ঠিক যেন জীবন্ত QR কোড। কোনো ঝামেলা হলে সহজেই বোঝা যাবে কোন জীব কোথা থেকে এসেছে।

এ ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, মানুষের গ্রহণযোগ্যতা, পরিবেশের ভারসাম্য, স্থানীয় অর্থনীতি, সবকিছুই বিবেচনা করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, একটা সমস্যা ঠিক করতে গিয়ে আরেকটা বিপদ ডেকে আনা হয়, যেমন বায়োফুয়েল নীতির (গাছ বা অন্য জীব থেকে তৈরি জ্বালানির নিয়ম) কারণে জমির ব্যবহার বাড়ায় ইউরোপে বন-জঙ্গল কমে গিয়েছিল।

সব মিলিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বায়োলজি ভবিষ্যতে পরিবেশের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, উন্নত উপাদান প্রযুক্তি, এসব যুক্ত হলে প্রযুক্তিটি আরও শক্তিশালী হবে। তবে এতে সময় লাগবে, হয়তো কয়েক দশক। বিজ্ঞান, নীতি, আর মানুষের গ্রহণযোগ্যতা, সবই মিলেই ঠিক করবে ভবিষ্যতের পথ ঠিক কী হবে।

যদি ভবিষ্যতে দূষণ পরিষ্কার করা, বায়ু বিশুদ্ধ করা, এমনকি নতুন পণ্য তৈরি করাও “জীবদের দায়িত্ব” হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষের ভূমিকা কীভাবে বদলে যেতে পারে।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: