শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০৮ অপরাহ্ন
জাতীয় নিরাপত্তা আজ আর কেবল সীমান্ত রক্ষা বা সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক সংহতি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি জনগণের ঐক্যবদ্ধ মানসিকতার সমন্বিত রূপ। একুশ শতকের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো রাষ্ট্রই কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নিরাপদ থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ এবং সেই জনগণের মধ্যে বিদ্যমান জাতীয় ঐক্য।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশে অবস্থান করছে। ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার হুমকি, তথ্যযুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থে একটি সর্বজনীন জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
জাতীয় নিরাপত্তার বিস্তৃত ধারণা
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় নিরাপত্তা বলতে শুধু বহিরাগত সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধকে বোঝায় না। এর অন্তর্ভুক্ত—রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, খাদ্য, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
অতএব, একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তখনই টেকসই হয়, যখন রাষ্ট্রের জনগণ নিজেদের রাষ্ট্রের অংশীদার বলে অনুভব করে এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকে। জনগণের নিরাপত্তাবোধ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও সুশাসন জাতীয় ঐক্যের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিবেশ
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিবেশ ক্রমেই জটিল হচ্ছে। একদিকে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, সাইবার অপরাধ, জঙ্গিবাদ ও সামাজিক মেরুকরণ; অন্যদিকে রয়েছে বহিরাগত ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সীমান্ত সমস্যা, রোহিঙ্গা সংকট এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং প্রতিবেশী শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করছে। এ বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অপরিহার্য।
জাতীয় ঐক্য : নিরাপত্তার প্রথম স্তম্ভ
জাতীয় ঐক্য মানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিলুপ্তি নয়; বরং মৌলিক জাতীয় স্বার্থে সর্বস্তরের মানুষের ঐকমত্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতের ভিন্নতা স্বাভাবিক, কিন্তু স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, রাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো বিভক্তি থাকা উচিত নয়।
বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজেই প্রকৃত জাতীয় ঐক্য বিকশিত হয়। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবাই অংশগ্রহণের সুযোগ পায় এবং রাষ্ট্রকে নিজেদের বলে মনে করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসও এ সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই ২০২৪, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা জাতীয় সংকটের মুহূর্তগুলোতে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েই সাফল্য অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।
গণতন্ত্র, সুশাসন ও রাজনৈতিক ঐকমত্য
জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি হচ্ছে একটি বৈধ, গ্রহণযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যখন জনগণ বিশ্বাস করে যে তাদের ভোটের মূল্য রয়েছে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন, প্রশাসন নিরপেক্ষ এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য—তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হয়। আর সেই আস্থাই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি।
গণতান্ত্রিক অধিকার, অবাধ নির্বাচন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে জাতীয় নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ‘Unity in Diversity’ বা ‘বৈচিত্র্যে ঐক্য’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। নীতি, আদর্শ ও নির্বাচনি কর্মসূচিতে পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থে সব রাজনৈতিক শক্তিকে একমত হতে হবে।
অর্থনৈতিক শক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা
অর্থনীতি জাতীয় শক্তির ভিত্তি। দুর্বল অর্থনীতি কখনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না। অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তাকেই দুর্বল করে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া সামরিক আধুনিকায়ন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কিংবা কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি—কোনোটিই যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন
জাতীয় ঐক্য কখনো সামরিক শক্তির বিকল্প নয়; আবার সামরিক শক্তিও জাতীয় ঐক্যের বিকল্প হতে পারে না। উভয়ই পরস্পরের পরিপূরক।
বর্তমান যুদ্ধের প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত স্থল, নৌ ও বিমানযুদ্ধের পাশাপাশি সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি, তথ্যযুদ্ধ এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ডোমেইন নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। ফলে বাংলাদেশকেও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, গবেষণা, প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সংযুক্ত আলোচনায় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি স্বেচ্ছাসেবী জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠনের ধারণাও উপস্থাপিত হয়েছে।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নীতিকে আরও বাস্তববাদী ও কৌশলগতভাবে প্রয়োগ করতে হলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বা ‘Bangladesh First’ নীতি অনুসরণ অপরিহার্য।
জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য রক্ষা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় পরিচয়, গবেষণা ও যুবসমাজ
দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার যুবসমাজ। দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিরক্ষা গবেষণায় যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করা হলে জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। যুবশক্তিকে ‘National Renewal’-এর প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
নীতিগত সুপারিশ
বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যকে টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—
১. জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে সর্বদলীয় স্থায়ী সংলাপ প্রতিষ্ঠা করা।
২. জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠন করা।
৩. অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করা।
৪. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান ও বৈষম্য হ্রাসকে নিরাপত্তা কৌশলের অংশ করা।
৫. প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন, সাইবার নিরাপত্তা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
৬. জাতীয় পরিচয়, নাগরিকত্ব ও সাংবিধানিক মূল্যবোধভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা বিকাশ করা।
৭. শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যুব উন্নয়নকে জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা।
উপসংহার
জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নয়; বরং একটি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী জাতি গঠন। বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য জাতীয় ঐক্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের পূর্বশর্ত।
মতাদর্শ, দলীয় রাজনীতি কিংবা নীতিগত বিতর্ক গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, জাতীয় স্বার্থ, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং জনগণের নিরাপত্তার প্রশ্নে সমগ্র জাতিকে এক কণ্ঠে কথা বলতে হবে। কারণ বিভক্ত জাতি কখনো শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে পারে না; কিন্তু ঐক্যবদ্ধ জাতি সীমিত সম্পদ নিয়েও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর ঐক্যের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারি, তার ওপর। জাতীয় ঐক্য তাই কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের অপরিহার্য ভিত্তি।
মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর, এনডিসি, পিএসসি (অব.)
চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ