শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন
আজকের এই ঝকঝকে দুনিয়া, জৌলুশপূর্ণ মোহময় অট্টালিকা আর প্রযুক্তির যে অভাবনীয় উৎকর্ষ আমরা দেখি, তার প্রতিটি ইটের ভাঁজে মিশে আছে শ্রমিক-মজদুরের রক্ত ও ঘাম। অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যাদের হাতে এই আধুনিক সভ্যতা নির্মিত হয়েছে, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং প্রান্তিক। প্রতিবছর পহেলা মে বিশ্বজুড়ে মহাসমারোহে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়। রাজপথে রঙিন ব্যানার, আলোচনা সভায় গগনবিদারী স্লোগান আর নীতিনির্ধারকদের আশ্বাসের ফুলঝুরি ফোটে। কিন্তু দিনশেষে একজন সাধারণ শ্রমিকের জীবনের অন্ধকার কি খুব বেশি ঘুচেছে ? নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে যখন দেখি, মাস শেষে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত পারিশ্রমিক এ টিফিন ভাতা বাবদ প্রতিদিন পাই পাচ টাকা ছিয়াত্তর পয়শা, চিকিৎসা ব্যয় বাবদ প্রতি মাসে ৩০০ টাকা ( পরিবারে পাচ জন সদস্যা হিসেবে ) , আমার সহকর্মী প্রতিদিন বেতন পায় ২৭৫ টাকা, কখনো কখনো এই পাওনাটুকুও পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। আমার একজন সহকর্মী তার ১০ মাসের মজুরী পেতে ১১ মাস ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, যে সহকর্মী তিন মাস পর অবসরে যাবেন।
যে ব্যবস্থাপনায় প্রায় এক বছরেও একজন কর্মীর হক মজুরি দিতে ব্যার্থ, আগামী ৩/৪ মাসে সেই ব্যবস্থাপনা তা দিতে পারবে, এ কথা ভাববার সেই যন্ত্রণা কেবল কলমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে হয়। এই বঞ্চনা প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়লেও আমরা মানসিকভাবে আজও মধ্যযুগীয় বর্বরতা কাটিয়ে পূর্ণ সভ্য হয়ে উঠতে পারিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেতন কাঠামোর দিকে তাকালে এক ভয়াবহ ও অমানবিক মজুরি বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে গুটিকতক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আকাশচুম্বী বেতন ও করপোরেট সুযোগ-সুবিধা, অন্যদিকে মূল উৎপাদনকারী শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি যা বর্তমান আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে স্রেফ একটি প্রহসন। বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যখন ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, তখন শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির হার থাকে অত্যন্ত মন্থর বা স্থবির। আইএলও (ILO) কনভেনশন ১৩১ অনুযায়ী, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশে তা প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে চা-বাগান বা অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মজুরি কাঠামোর ব্যবধান এতটাই বেশি যে, একে সামাজিক অবিচার বললেও কম বলা হয়। এই প্রকট অর্থনৈতিক বৈষম্য কেবল শ্রমিকের জীবনযাত্রার মানকেই ব্যাহত করছে না, বরং একটি সুস্থ ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের এই তথাকথিত উন্নত ও সাম্রাজ্যবাদী পৃথিবী কোনোদিন শ্রমিককে মালিক হিসেবে বা সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল না। মালিকপক্ষ এবং নীতিনির্ধারকদের একাংশের মানসিকতায় শ্রমিক আজও কেবল এক উৎপাদনশীল যন্ত্র মাত্র। শ্রমিকের ক্ষমতায়ন বা মুনাফায় তাদের অংশীদারিত্বের বিষয়টি কল্পনা করতেও অনেকে কুণ্ঠিত হন। পুঁজিবাদের এই নিষ্ঠুর থাবা শ্রমিককে কেবল শোষণের বস্তু হিসেবেই দেখেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহযোগী পুঁজিবাদ কখনোই শ্রমিকের হাতে মালিকানার চাবিকাঠি দেখতে চায়নি, বরং মজুরি বঞ্চনা ও বিলম্বিত পরিশোধের মাধ্যমে তাদের সবসময় অভাবের বৃত্তে বন্দি করে রাখতে চেয়েছে। এই যে শ্রমিককে ‘মালিক’ হিসেবে মেনে না নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যতা, এটিই আমাদের সমাজ কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অথচ প্রতিটি শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল বিপ্লব, সবই শ্রমিকের কায়িক ও মানসিক পরিশ্রমের ফসল।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের দ্ব্যর্থহীন বার্তা হলো, কেবল দিবস পালন বা দাতা সংস্থাগুলোর মন রক্ষার্থে লোক দেখানো নীতিমালা প্রণয়ন করে শ্রমিকের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের (যেমন আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮) আলোকে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার পূর্ণ অধিকার এবং ভীতিহীন পরিবেশে যৌথ দরকষাকষির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বেতন কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠন করা জরুরি যেখানে ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণ উপযোগী সম্মানজনক মজুরি নিশ্চিত হয়। কোনো শ্রমিক যেন তার পাওনা আদায়ের জন্য রাজপথে রক্ত দিতে বাধ্য না হয়, সেই দায়ভার রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ করে দ্রুততম সময়ে পাওনা পরিশোধের কঠোর আইনি বাধ্যবাকততা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্যই আত্মঘাতী ও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবে।
একইসাথে অধিকার সচেতন শ্রমিক ভাইদের প্রতি আমার আহ্বান, বিচ্ছিন্নভাবে নয় বরং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমেই অধিকার আদায় সম্ভব। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর সেই উত্তাল দিনগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে, দাবি আদায় করতে হলে সংহতির কোনো বিকল্প নেই। সচেতন শ্রমিকদের উচিত হবে নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করা এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামষ্টিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। মনে রাখবেন, আমাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই এই পৃথিবীর অর্থনীতি সচল থাকে; আমরা থেমে গেলে থমকে যাবে এই জৌলুশপূর্ণ দুনিয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীর শেষ শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার ন্যায্য পাওনা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘সভ্য সমাজ’ বা ‘উন্নত রাষ্ট্র’ শব্দবন্ধগুলো কেবল একটি কুৎসিত কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। আসুন, আমরা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি যেখানে মালিক-শ্রমিক ব্যবধান ঘুচে গিয়ে গড়ে উঠবে এক সমতা ভিত্তিক মানবিক সমাজ। মে দিবসের এই দিনে এটাই হোক আমাদের দৃপ্ত শপথ।
লেখক: মুকুল হোসেন, স্বাস্থ্য শ্রমিক ও শ্রমিক অধিকার কর্র্মী।