সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন
ছোট শিশুদের সামান্য জ্বর দেখা দিলেই অভিভাবকদের পাশাপাশি চিকিৎসকদের মধ্যেও চরম উদ্বেগ তৈরি হয়। নবজাতকদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নেওয়ার মানসিকতা থেকে চিকিৎসকেরা প্রায় সময়ই কালবিলম্ব না করে কড়া সব অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা শিশুদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশের শরীরে গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন বা জীবাণুর সংক্রমণ থাকে। এর ফলে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশুই অপ্রয়োজনীয়ভাবে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের ধকল সহ্য করতে বাধ্য হয়, যা তাদের ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের এই যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার সংকট দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। ভবিষ্যতে যখন সত্যিই শিশুদের শরীরে ব্যাকটেরিয়ার মারাত্মক আক্রমণ হবে, তখন এই জীবাণুগুলো এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে প্রচলিত কোনো ওষুধই আর কাজ করবে না। মূলত সাধারণ ভাইরাল ইনফেকশন এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত জ্বরের মধ্যে পার্থক্য করার গতানুগতিক পদ্ধতিগুলোর ফলাফল পেতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগে। রোগীর সুরক্ষার কথা ভেবে চিকিৎসকদের পক্ষে এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা সম্ভব হয় না বলেই মূলত আগাম সতর্কতা হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে দেওয়া হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই জটিল সংকটের একটি অভিনব সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন গবেষকেরা। বিজ্ঞানীরা এমন একটি বিশেষ রক্তপরীক্ষা উদ্ভাবন করেছেন, যা মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জানিয়ে দিতে পারে শিশুর জ্বরটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে নাকি ভাইরাসের আক্রমণে হয়েছে। এই যুগান্তকারী পরীক্ষার মূল ভিত্তি হলো রক্তের শ্বেতকণিকার দুটি নির্দিষ্ট প্রোটিন—সিডি৬৪ এবং সিডি১৬৯। শরীরে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঘটলে নিউট্রোফিল নামের শ্বেতকণিকার গায়ে প্রথম প্রোটিনটির মাত্রা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়, আর ভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় মনোসাইট নামের শ্বেতকণিকায় দ্বিতীয় প্রোটিনটির উপস্থিতি বাড়ে।
সম্প্রতি প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই পরীক্ষার অত্যন্ত সফল ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে। ইতালির জিয়ান্নিনা গ্যাসিলিনি ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা নবজাতক শিশুদের ওপর এই পরীক্ষা চালিয়ে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছেন। এর আগে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই প্রোটিন টেস্ট সফল হলেও নবজাতকদের অপরিপক্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে সংশয় ছিল। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে ছোটদের ক্ষেত্রেও এটি শতভাগ নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকেরা ইতিমধ্যে একটি ছোট পোর্টেবল ডিভাইস তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে আঙুলের মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই জ্বরের সঠিক কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হবে।