রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন মোকাবেলার জন্য দীর্ঘ এক শতাব্দী পর নতুন করে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সাজাচ্ছে কানাডা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিতর্কিত মন্তব্যের পর দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে এই নতুন চিন্তার সূত্রপাত হয়েছে। যদিও খোদ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্বীকার করেছেন যে এমন হামলার ঝুঁকি অত্যন্ত কম, তবুও সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি গ্রহণের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কানাডার নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকরা যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকতে চাইছেন।
দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার কারণে মার্কিন সামরিক হামলার সম্ভাবনাকে বরাবরই অতি নগণ্য বলে মনে করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয় দেশই ন্যাটো জোটের সদস্য এবং নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের অধীনে তারা যৌথভাবে উত্তর মেরু অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে থাকে। তা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের আটকের পর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে যে দেশটির প্রায় ত্রিশ শতাংশের বেশি সাধারণ নাগরিক মার্কিন আগ্রাসনের আশঙ্কা করছেন। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতি এবং দুই দেশের নিবিড় সম্পর্কের কারণে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের চেয়ে সাইবার যুদ্ধ বা অন্য কোনো উপায়ে উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।
কানাডার জাতীয় নিরাপত্তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করার একটি সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে দেশটির। আধুনিক কানাডা রাষ্ট্র গঠনের পূর্বেও আমেরিকান বাহিনী একাধিকবার ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিল, যা কানাডীয়দের মনে একধরনের ঐতিহাসিক সতর্কতার জন্ম দেয়। এমনকি বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণ মোকাবেলার জন্য কানাডার সামরিক বাহিনী গোপনে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল এবং সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার তথ্য সংগ্রহ করেছিল। গবেষকদের মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন সামরিক বাহিনীর প্রাত্যহিক কাজেরই একটি অংশ, যার মূল লক্ষ্য হলো যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি এখন কানাডার নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন কিছু জটিল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ শ্মিট। মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে অতিনিরীহভাবে তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখলে তা ভবিষ্যতে নিজেদের বিপদের কারণ হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ কোনো সংঘাত বাধলে কৌশলগত অবস্থানগুলো হাতছাড়া হতে খুব বেশি সময় না লাগলেও কানাডীয় বাহিনী পরবর্তীতে গেরিলা যুদ্ধ কৌশলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ভাবতে পারে। পরিশেষে, আমেরিকানরা ট্রাম্পের মন্তব্যগুলোকে হয়তো কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবে দেখছেন, কিন্তু কানাডার সাধারণ মানুষ ও প্রশাসন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছে।