শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন
আইন-আদালত ডেস্ক: বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিচারিক অভিজ্ঞতার বাধার প্রাচীর কার্যত তুলে দেওয়া হয়েছে। সহকারী জজ থেকে শুরু করে জেলা ও দায়রা জজ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রবর্তিত নতুন বিধিমালার ফলে বিচারকাজে সরাসরি অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন। এর ফলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সঠিক ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বিচারকদের মাঝেও এ নিয়ে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, এই বিতর্কিত পরিবর্তনের কারণে পুরো বিচারব্যবস্থায় মারাত্মক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। গত বছরের নভেম্বর মাসে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন এই বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই ২০০৭ সালের পুরনো ও সুনির্দিষ্ট বিধিমালাটি রহিত হয়ে নতুন এই বিধান কার্যকর করা হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ অনেক আইন ও বিধি সংশোধিত বা বাতিল হলেও এই বিতর্কিত বিধিমালাটি বহাল রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সংশোধিত এই নতুন বিধিমালার অধীনে এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক বিচারিক কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন, যাদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় বিচারিক অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে একদিনের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকার পরও একাধিক কর্মকর্তা সরাসরি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেছেন। পুরনো বিধিমালায় প্রতিটি স্তরে পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে বিচারিক পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু নতুন বিধমালায় ‘বিচারক’ পদের সেই বাধ্যবাধকতা শিথিল করে ‘সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে’ অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন বিচারালয় থেকে দূরে প্রেষণ বা অন্যান্য দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতির পথ সুগম হয়েছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের পুরনো বিধিমালা অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ বা সমপর্যায়ের বিচারক হিসেবে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা আবশ্যক ছিল। নতুন বিধিমালায় সেই যোগ্যতা পরিবর্তন করে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ কিংবা সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ ১৫ বছরের কর্মের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে মূল শব্দ হিসেবে থাকা ‘বিচারক’ ও ‘চাকরি’ শব্দ দুটি বাদ দিয়ে যথাক্রমে ‘অন্যান্য পদ’ ও ‘কর্মের অভিজ্ঞতা’ যুক্ত করা হয়েছে। কেবল শীর্ষ পদটিই নয়, বরং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং সিনিয়র সহকারী জজ পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। একইভাবে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতির শর্তেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের নিয়মে এই পদে পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াসহ সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। নতুন বিধিমালায় সেই পদোন্নতি পরীক্ষার শর্তটি সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং কর্মের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। পদের নাম ও নিয়োগ পদ্ধতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। আগের বিধান অনুযায়ী পদোন্নতি পেতেন কেবল বিচারক পদধারীরা, আর নতুন বিধিমালার অধীনে সেই সুযোগ পাচ্ছেন যেকোনো ‘সার্ভিস সদস্য’। এই পরিবর্তনের ফলে বিচারিক কাজের চেয়ে প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকারীরাও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমান সুবিধা পাচ্ছেন। বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিচারিক দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে যা বিচারক পদের পদোন্নতিতে বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল। কিন্তু নতুন নিয়মের মারপ্যাচে এই পার্থক্যের রেখাচিত্র ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছে।
নতুন বিধিমালার ৫ নম্বর বিধির শিরোনাম ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্বে যে পদায়নগুলোকে প্রেষণ হিসেবে গণ্য করা হতো, এখন তা সাধারণ নিয়োগ বা বদলি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। পুরনো বিধিমালার ৭ বিধিতে সুপ্রীম কোর্ট ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগের স্পষ্ট বিধান ছিল। কিন্তু নতুন নিয়মে ‘প্রেষণ’ শব্দটির পরিবর্তে নিয়োগ বা বদলির কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য দপ্তরে কাটানো সময় এখন ‘সমপর্যায়ের অন্যান্য পদে’ অভিজ্ঞতা হিসেবে অনায়াসে গণনা করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা দুই বছর দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেই সরাসরি জেলা ও দায়রা জজ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করছেন, যেখানে তার বিচারকাজের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও কোনো বাধা থাকছে না। দ্বিতীয় তফসিলেও ঠিক একই ধরনের পরিবর্তনের ধারা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পদায়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এসেছে। বিচার বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, একজন জেলা ও দায়রা জজ কেবল মামলাই নিষ্পত্তি করেন না, বরং তিনি দায়রা মামলার বিচার কাজ পরিচালনা করেন। অধস্তন আদালতের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি এবং জেলার সকল আদালত পরিদর্শন ও তদারকির মূল দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত থাকে। নতুন বিধিমালার বিধি অনুযায়ী তিনি দেওয়ানি ও দায়রা আদালত, লিগ্যাল এইড এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ফলে অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে কেউ আসীন হলে পুরো বিচারিক শৃঙ্খলা ও তদারকি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারিক অভিজ্ঞতা শিথিল করার নজির থাকলেও তা সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো। কিন্তু সার্বজনীন ও স্থায়ীভাবে এই শর্ত তুলে দেওয়ায় বিচার বিভাগের মান ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
পদোন্নতি প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ধাপগুলোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে যা বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। আগের নিয়মে হাইকোর্ট রুলস অনুযায়ী গঠিত সুপ্রিম কোর্টের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কমিটির বিচারপতিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠিত হতো এবং তারাই পদোন্নতির জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করতেন। কিন্তু নতুন বিধিমালার ৬(২) বিধি অনুযায়ী সেখানে একটি অতিরিক্ত ও নতুন ধাপ যুক্ত করা হয়েছে। এখন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি প্রথমে সুপারিশ করবে এবং সেই সুপারিশ পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিটির বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত বাছাই কমিটি যাচাই করবে। অর্থাৎ প্রথম সুপারিশের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাত থেকে কিছুটা হলেও নির্বাহী বিভাগের গঠিত কমিটির হাতে চলে গেছে। এছাড়া ২০০৭ সালের বিধিমালার নামে ‘শৃঙ্খলা বিধান’ থাকলেও নতুন বিধিমালার নামে সেই শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়নি। এই সমস্ত পরিবর্তনের ফলে বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ঐতিহ্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিচার বিভাগের স্বকীয়তা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞতার শর্ত পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় বিচারাঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা এবং বিচারকদের মাঝে তৈরি হওয়া অসন্তোষ আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা অটুট রাখতে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন বলে আশা করছেন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা।