শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের ঘামঝরা এই অর্থ শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটায় না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও সমৃদ্ধ করে।
তবে দীর্ঘদিন ধরেই রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাহিত হওয়ায় এর পূর্ণ সুফল পাচ্ছিল না দেশের অর্থনীতি। এই প্রেক্ষাপটে এজেন্ট ব্যাংকিং হয়ে উঠেছে এক নতুন সম্ভাবনার নাম। এই সম্ভাবনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং।
দেশব্যাপী ব্র্যাক ব্যাংকের ১,১২০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সহজ, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবার ফলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ফিরছে প্রবাসী আয়, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে, বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চলে অবৈধ চ্যানেলের দৌরাত্ম্য ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশই ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থেকে যেত। গ্রাম-পাড়া-মহল্লায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের ফলে এখন ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে মানুষের দোরগোড়ায়।
এই চ্যানেলের মাধ্যমে ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক ২,৭২০ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বিতরণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। তবে শুধু প্রবৃদ্ধির অঙ্ক নয়, পরিবর্তনের মূল গল্প লুকিয়ে আছে ব্যাংকটির সেবার ধরনে। মোট অর্থের প্রায় ৮৫ শতাংশই সরাসরি গ্রাহকের হিসাবে জমা হয়েছে। ফলে নগদ নির্ভরতা কমেছে, বেড়েছে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা।
এই পরিবর্তন গ্রামীণ জীবনে তৈরি করছে নতুন বাস্তবতা। আগে যেখানে প্রবাসী আয়ের টাকা তুলতে শহরে যেতে হতো, এখন সেই অর্থ হাতের কাছেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে যেমন সময় ও খরচ বাঁচছে, তেমনি আর্থিক সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। রেমিট্যান্স গ্রাহকরা ব্যাংকটির ‘প্রবাসী পরিবার অ্যাকাউন্ট’ সেবার মাধ্যমে সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, যেখানে সুবিধাভোগীদের জন্য থাকছে বাড়তি নানা সুবিধা।
শুধু অর্থ পৌঁছে দেওয়াই নয়, সেই অর্থকে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি করছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির ‘স্বাবলম্বী’ ঋণসেবার মাধ্যমে রেমিট্যান্স গ্রাহকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে ৪,৫০৬ জন গ্রাহক এই সুবিধা নিয়েছেন, যার মোট পরিমাণ ৪৯০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ব্যাংকের মোট ‘স্বাবলম্বী’ ঋণের ৬১ শতাংশের বেশি এসেছে এই চ্যানেল থেকে, যা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতি গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।
ব্যাংকটির বিভিন্ন গ্রাহকবান্ধব উদ্যোগের ফলে প্রবাসী আয়ের ব্যবহারেও এসেছে পরিবর্তন। কেবল ভোগব্যয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে রেমিট্যান্স সুবিধাভোগীরা এখন ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি বা অন্যান্য আয়ে বিনিয়োগ করছেন। এর ফলে তৈরি হচ্ছে স্বনির্ভরতার নতুন পথ এবং সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান।
দেশব্যাপী এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা প্রসঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব অল্টারনেট ব্যাংকিং চ্যানেলস নাজমুর রহিম বলেন, “দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ সহজ করতে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছি। আমরা বিশ্বাস করি, উদ্ভাবনী ও সুবিধাজনক ব্যাংকিং সেবা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সেবা সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ এখন অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চ্যানেল থেকে সরে এসে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে ব্যক্তি ও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হচ্ছে।
বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যাত্রায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্র্যাক ব্যাংকের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে—সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব দেশের প্রতিটি প্রান্তে।
রেমিট্যান্সের এই নতুন যাত্রায়, গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই বদলে যাচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গল্প। ব্র্যাক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের হাত ধরে সেই গল্প এখন আরও গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের অর্থায়নে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি. ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাংক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ‘BRACBANK’ প্রতীকে ব্যাংকটির শেয়ার লেনদেন হয়।
৩১০টি শাখা ও উপশাখা, ৩৩০টি এটিএম, ৪৪৬টি এসএমই ইউনিট অফিস, ১,১১৯টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ১০ হাজারের বেশি কর্মীবাহিনী নিয়ে ব্যাংকটি করপোরেট ও রিটেইল উভয় সেগমেন্টে সেবা দিচ্ছে।
বিশ লাখের বেশি গ্রাহক নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক গত ২৪ বছরে দেশের বৃহত্তম জামানতবিহীন এসএমই অর্থায়নকারী ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নিয়মানুবর্তিতায়ও ব্যাংকটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।