শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্ন
মাত্র ২ দিন আগে নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বানের পর সেখানে চলছে উদ্ধারকাজ; কিন্তু এর মধ্যেই ফের নতুন করে বানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে সেখানে।
শুক্রবার তিব্বতের দিকে তৈরি হওয়া একটি ব্যারিয়ার হ্রদ উপচে পড়ার খবর আসতেই রসুয়া এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ত্রিশূলী নদীতে জলস্তর বাড়ার আশঙ্কায় চিতওয়ান ও ধাদিংয়ে হড়পা বানের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীর কাছাকাছি থাকা মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলা হয়েছে।
‘ব্যারিয়ার হ্রদ’ হলো এমন এক ধরনের হ্রদ, যা সাধারণত কোনও নদী বা জলপ্রবাহের পথ প্রাকৃতিক বাধায় আটকে গিয়ে তৈরি হয়। বুধবার নেপাল-তিব্বতে যে ভয়াবহ আকস্মিক বান দেখা দিলো, সেটির কারণও একটি ব্যারিয়ার হ্রদ। তুষার ধসের জেরে নেপাল চীন সীমন্তবর্তী ভোতি কোশি নদীর শাখানদী লেহেন্দে নদী একাংশ একটি ব্যারিয়ার হ্রদ তৈরি হয়েছিল। নদীর পানিপ্রবাহের প্রবল চাপে একসময় সেই হ্রদ ভেঙে পড়ে এবং আটকে থাকা লাখ লাখ ঘনমিটার মিটার পানি লেহেন্দ নদী থেকে প্রবেশ করে ভোতিকোশিতে। তার জেরেই বুধবার বেলা ১০টা ৩০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয় নেপালের সীমান্তবর্তী জেলা রাসুয়া এবং তিব্বতের সীমান্তবর্তী জেলা গিরংয়ে।
আজ শুক্রবার সকালে নেপালের রসুয়া জেলার প্রশাসনের কাছে খবর আসে, সীমান্তের ওপারে তৈরি হওয়া একটি জলাধারের বাঁধ ভেঙে পানি বেরিয়ে আসছে। এরপরই নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে বলে জানান রসুয়া জেলার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।
তবে জলস্তর ঠিক কতটা বেড়েছে, সেই সময় তা স্পষ্ট ছিল না। চীনের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ছোছেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলের কাছে একটি বড় ব্যারিয়ার হ্রদ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালেই সেখানে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার পানি জমেছিল এবং পরে সেটি উপচে পড়তে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে তিব্বতের গিরং সীমান্ত বন্দরের কাছেও উদ্ধারকাজ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। ব্যারিয়ার হ্রদে পানির চাপ বাড়ায় নতুন করে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৯০ মিনিটের জন্য বন্ধ উদ্ধারকাজ
ব্যারিয়ার হ্রদ উপচে পড়ার খবর পাওয়ার পর নেপালের রসুয়া জেলায় প্রায় ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখা হয়। হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে থামানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে পাহাড়ের উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করেন। নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে উদ্ধারকারী দল, নিরাপত্তাকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিব্বতের দিকে ফের জলের চাপ বাড়ার খবর পাওয়ার পর সবাইকে নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলা হয়েছে।
চিতওয়ান-ধাদিংয়ে আকস্মিক বন্যার সতর্কতা
শুধু রসুয়া নয়, চিতওয়ান ও ধাদিং এলাকাতেও নতুন করে হড়পা বানের সতর্কতা জারি হয়েছে। ত্রিশূলী নদী দিয়ে আচমকা বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের সতর্কবার্তা জারি হওয়ার পর নদীসংলগ্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নিচু এলাকার বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু জায়গার দিকে সরে যাচ্ছেন। কেউ হেঁটে, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। নদীর পানিপ্রবাহ আচমকা বেড়ে গেলে ফের হড়পা বানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। তাই নদীর কাছে না যাওয়ার জন্য স্থানীয়দের সতর্ক করা হয়েছে। নদী সংলগ্ন এলাকায় নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
মৃতের সংখ্যা ৪৭২, নিখোঁজ প্রায় হাজার
এর মধ্যেই নেপালের ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭২ জনে পৌঁছেছে। নেপাল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ১,৫০০-র কাছাকাছি। তিব্বতে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গিয়েছে। নেপাল সরকারের হিসাবে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক এখনও নিখোঁজ।
উদ্ধারকাজে ১৩ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী
বিপর্যস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ১৩,২৯৫ জন নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে নেপাল। এর মধ্যে রয়েছেন–নেপাল পুলিস ৭,২৫০ জন, নেপাল সেনা ৪,২০০ জন, আর্মড পুলিস ফোর্স ১,৮৪৫ জন। এছাড়াও ১৫টি হেলিকপ্টার উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ২,৫২৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। হেলিকপ্টারে নিরাপদ জায়গায় সরানো হয়েছে ১,১৯৬ জনকে।
তিন জেলায় আর্থিক সহায়তা
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তিন জেলা—রসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদি’র জন্য আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছে নেপালের সরকার। রসুয়া ও নুয়াকোটকে দেওয়া হয়েছে ১ কোটি করে নেপালি রুপি করে। ধাদিং পেয়েছে ৫০ লক্ষ নেপালি রুপি।
বস্তুত, বুধবারের ভয়াবহ হড়পা বানে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল এখনও ধ্বংসস্তূপ এবং নদীর আশপাশে নিখোঁজদের খুঁজছে। কিন্তু নতুন করে জলাধার উপচে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে চলছে নিখোঁজদের খোঁজ, অন্যদিকে ফের হড়পা বানের আশঙ্কা। তাই আপাতত নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।