শনিবার, ২৭ Jun ২০২৬, ০৭:১৯ অপরাহ্ন

অগ্রগতির মাঝেও বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক বাস্তবতা – ইমদাদ ইসলাম

বিভিন্ন আর্থসামাজিক সূচকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, বাল্যবিবাহের সমস্যাটির থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এটা ঠিক বাল্যবিবাহের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে বিগত বছরগুলোতে এই ক্ষতিকারক প্রথার প্রকোপ কমতে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়, সংখ্যাটি উদ্বেগজনকভাবে বেশি। সরকার, সিভিল সোসাইটি, এনজিওসহ সমাজের সব স্তরের মানুষকে এ সমস্য সমাধানের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

২০২৫ সালের হিসেবে, এই বছরের ৮ মার্চ ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যায় বাংলাদেশে ৫১.৪ শতাংশ মেয়ে অর্থাৎ প্রতি দুই জন মহিলার মধ্যে এক জনের ১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে হয়, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ বাল্যবিবাহের হার। বাল্যবিবাহের স্থায়িত্বের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো লিঙ্গ বৈষম্য, দারিদ্র্য, সামাজিক রীতিনীতি, জলবায়ু-সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনি কাঠামোর ফাঁকফোকর। বাল্যবিবাহ মেয়েদের শারীরিক, মানসিক এবং সমাজের উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। এটি শিক্ষাকে ব্যাহত করে, বিবাহিত মেয়েদের স্কুল শেষ করার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়, যা দারিদ্র্য এবং বৈষম্যকে স্থায়ী করে। স্বাস্থ্য ঝুঁকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়, যার ফলে মাতৃমৃত্যুর উচ্চ হার আমরা দেখতে পাই। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে প্রসূতি জটিলতা সৃষ্টি হয়। সামাজিকভাবে, এটি লিঙ্গ বৈষম্যকে আরও দৃঢ় করে, যা দেশের উন্নয়নে মেয়েদের অবদানকে সীমিত করে।

২০২৩ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে দরিদ্রতম পরিবারগুলোতে ধনী পরিবারের তুলনায় ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তিন গুণেরও বেশি। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকারক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বাল্যবিবাহকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার একটি বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখে, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তারা দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেন না। আর্থসামাজিক অবস্থা এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বাল্যবিবাহের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। যেহেতু অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের শিক্ষারব্যবস্থা করতে পারে না এবং দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ দেখতে পায় না, তাই তারা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়াকেই তাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করে।

যৌতুক ভারতীয় উপমহাদেশে একটি প্রাচীন প্রথা, যার প্রভাব আজও সমাজে চলে আসছে।বিয়ের ক্ষেত্রে, এখনও যৌতুক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা এখনও পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যত কম বয়সে মেয়ে বিয়ে দেওয়া যাবে ,তত কম যৌতুক লাগবে। আমাদের সমাজে আরও একটি বিষয় কুসংস্কার রয়েছে , মেয়েরা বড়ো হওয়ার সাথে সাথে তারা কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং এর ফলে যৌতুকের হার বৃদ্ধি পায়। দেশে যৌতুক প্রথা এবং বিবাহের সাথে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক লেনদেন এখনও সামাজিক মর্যাদাকে প্রভাবিত করে, সেজন্যই মা-বাবার তাদের মেয়েদের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য কম বয়সে বিয়ে দেন এবং নিজেদের ঝামেলামুক্ত মনে করেন। কিছু কিছু অঞ্চলে, মেয়ে শিক্ষিত হলে বেশি যৌতুক দিতে হয়, কারণ ঐসব মেয়েদের কম ‘আকাঙ্ক্ষিত’ বলে মনে করা হয়। আমাদের সমাজে বিয়ের সময় কনের পরিবার থেকে বর বা তার পরিবারে অর্থ, জিনিসপত্র বা সম্পত্তি যৌতুক হিসেবে হস্তান্তরের প্রথা চালু রয়েছে, যা বাল্যবিবাহ বন্ধে একটি বড়ো সমস্য।

আমাদের সমাজের আরেকটি বড়ো সমস্যা হলো আমরা কখনই নারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদান করতে পারিনি। আজকাল, নারীরা অনেক উদ্বেগের সাথে বসবাস করছেন, কারণ পাবলিক প্লেসে হয়রানি এখন আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে নারীদের প্রতি সহিংসতার খবর আমরা দেখছি। ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে । আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সমর্থ অনুযায়ী চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে অগ্রগতি আছে, বিচারে শাস্তি হচ্ছে তবুও ধর্ষণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা, বিশেষ করে ধর্ষণ, বেড়ে যায়। অনেক পরিবার বিশ্বাস করে যে বাল্যবিবাহ মেয়েদের অনাচার এবং বিশৃঙ্খলার হুমকি থেকে রক্ষা করে। যদিও এটা খুবই ভুল ধারণা। তাদের ধারণা একটি কাঠামোগত বৈবাহিক ব্যবস্থা, যা প্রায়শই সামাজিক নিরাপত্তার একটি রূপ হিসেবে দেখা হয়, একটি অল্পবয়সী মেয়েকে অস্থির সমাজের দুর্বলতার মুখোমুখি রাখার চেয়ে একটি নিরাপদ বিকল্প প্রদান করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোভিড-১৯ মহামারির মতো বিপর্যয়কর ঘটনাগুলোর সময় বাল্যবিবাহ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। এই ধরনের সংকটের সময় অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘবের জন্য দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাল্যবিবাহের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। করোনা অতিমারি চলাকালীন স্কুল বন্ধ থাকার ফলে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল, কারণ মেয়েদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। স্কুলগুলো যে সুরক্ষামূলক পরিবেশ এবং শিক্ষার সুযোগ প্রদান করে তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছিল। অনেক মা-বাবা এটিকে তাদের মেয়েদের কম খরচে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন, কারণ করোনাকালে বিবাহের আয়োজন করা কম ব্যয়বহুল ছিল।

বাংলাদেশের আইনি কাঠামো বাল্যবিবাহকে সম্পূর্ণভাবে রোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। যদিও মেয়েদের জন্য ন্যূনতম বিয়ের বয়স ১৮ বছর, ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণ আইন “বিশেষ পরিস্থিতিতে” ব্যতিক্রমগুলোকে অনুমোদন দেয়, যা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৩ সালে বিশেষ পরিস্থিতিতে ৩২ শতাংশ বাল্যবিবাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিলো। আর একটা বড়ো সমস্য হলো যারা বিবাহ পরিচালনা করে অর্থাৎ স্থানীয় কাজী, তারা কনের বয়স গোপন করতেও সাহায্য করে। কনের বয়স কম জেনেও তারা বিবাহ পরিচালনা করে। জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব কফি আনান এই নীতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, “বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানো একটি ভুল পদক্ষেপ।” দুর্বল প্রয়োগ আইনি সুরক্ষাকে আরও দুর্বল করে, যা বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে। আমাদের সমাজে এখনও পরিবারের সদস্যরাও মেয়ে এবং ছেলে সন্তানের মধ্যে বৈষম্য করে। নারীদের বোঝা মনে করার মানসিকতা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সামগ্রিকভাবে সমাজের সবাইকে বুঝতে হবে যে একটি মেয়ের জীবনে বিয়ের চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে। সমাজে মেয়েদের ভবিষ্যৎ সম্ভবনা পরিবারসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষকে বুঝতে হবে। মানুষ হিসেবে নারীর প্রকৃত সম্ভাবনা আমরা যদি বুঝতে না পারি তাহলে আমরা এই সামাজিক ব্যাধির অবসান ঘটাতে সক্ষম হব না।

শিক্ষা ক্ষমতায়নের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যখন মেয়েরা শিক্ষিত হয়, তখন তাদের আরও পছন্দ থাকে এবং বাল্যবিবাহে বাধ্য হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। বাল্যবিবাহ রোধে মেয়েদের শিক্ষায় বেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর মধ্যে একটি। শিক্ষিত মেয়েদের বিয়ে বিলম্বিত হওয়ার, কম সন্তান জন্ম দেওয়া এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেক কমে যায়। বাংলাদেশে বেশিরভাগ বাল্যবিবাহ বিরোধী প্রচারণা শুধু মহিলাদের লক্ষ্য করা হয়। বিবাহ প্রতিরোধের দায়িত্ব মহিলাদের উপর ন্যস্ত করা হয়, তবে প্রায়শই এই সিদ্ধান্তগুলো পুরুষেরা নিয়ে থাকে। এজন্য সচেতনতামূলক প্রচারের কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য অধিদফতর, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর,চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতার বাল্যবিবাহ বন্ধে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সমাজের সবার সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই দেশের এবং পরিবারের স্বার্থে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হবে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়

 


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: