বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৮ অপরাহ্ন
ইরানের নতুন হামলার পর দেশটির সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বুধবার উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলার পর তুরস্কে উত্তর আটলান্টিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন।
ইরান জানিয়েছে, প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
নতুন এই সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়ার আশা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
সমঝোতা স্মারকটি শেষ হয়ে গেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি খুবই আকর্ষণীয় প্রশ্ন। আমার কাছে মনে হয়, এটি শেষ। আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা নিকৃষ্ট মানুষ। তারা অসুস্থ মানসিকতার মানুষ এবং অসুস্থ মানসিকতার লোকদের নেতৃত্বে রয়েছে। আমার কাছে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা সময়ের অপচয়।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা দেয়। একই সঙ্গে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নৌপরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত চারটি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ প্রণালি অতিক্রম না করে ফিরে গেছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একদিনে ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে পৌঁছায়। যদিও এটি যুদ্ধের তীব্র সময়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি দামের তুলনায় অনেক কম, তবুও এটি মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা একটি যুক্তরাষ্ট্রের মানববিহীন নজরদারি বিমান ভূপাতিত করেছে।
এর আগে প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন সামরিক অভিযান চালায় এবং ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া বিশেষ লাইসেন্স বাতিল করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, অভিযানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ৬০টির বেশি ছোট নৌযানসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে নৌপরিবহনে হামলার জন্য ইরানকে বড় মূল্য দিতে বাধ্য করাই ছিল এই অভিযানের উদ্দেশ্য।
কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি বাহিনীর অযৌক্তিক আগ্রাসন যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট ও বিপজ্জনক লঙ্ঘন এবং এটি নৌপথে অবাধ চলাচলের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
উত্তর আটলান্টিক জোটের মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা ছিল ‘সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয়’।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের হামলা গ্রহণযোগ্য নয়।
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘স্পষ্ট আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে এর ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, প্রণালি পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, সাম্প্রতিক সামরিক হামলা, পুনরায় তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ, প্রণালিতে ইরানের পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ এবং লেবাননে ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
তিনি বলেন, ‘ভয়ভীতি ও জোরজবরদস্তির যুগ শেষ। আমরা নতি স্বীকার করব না।’
এর আগে ইরানের গণমাধ্যমে দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ, কেশম দ্বীপ এবং দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক ও বন্দর আব্বাস শহরে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশিত হয়। তবে ইরানে কোনো বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, অভিযানে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং মানববিহীন বিমান উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তেল বিক্রির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে যুদ্ধ অবসানের কাঠামোগত সমঝোতার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর পরিণতির দায় ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সূত্র: রয়টার্স