বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০৩:৫১ অপরাহ্ন

নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধ করুন

অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের দেশের নারীরা সমাজের বহু যুগের বন্ধ অর্গল একের পর এক ভেঙে সামনে এগিয়ে চলছেন। বিশেষত নেতৃত্বে প্রশ্নে আমরা সৃষ্টি করেছি বৈশ্বিক উদাহরণ। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আমরা যেভাবে নারীর ‘ক্ষমতায়ন’ দৃশ্যমান করতে পেরেছি, তা অনেক উন্নত বিশ্বেও বিরল। গত আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে আমরা একটানা নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়ে এসেছি; বর্তমান সংসদে স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী। সংসদে, মন্ত্রিসভায়, প্রশাসনে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কেবল নয়; অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের নতুন নতুন নজির। দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বা লিঙ্গ সাম্য-সংক্রান্ত নীতি ও কাঠামোগত ব্যবস্থাও মন্দ নয়।

কিন্তু তার পরও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান এখনও কতটা নাজুক, সম্প্রতি চিত্রনায়িকা পরীমণিসহ বিভিন্ন পেশার কয়েকজন নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে আরেকবার প্রমাণ হলো। এখনও তদন্ত ও বিচারাধীন কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনের আওতায় নেওয়ার পর আইনি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে তাদের যেভাবে সংবাদমাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা আমাদের হতাশ না করে পারে না। রোববার সমকালে ‘নারী সম্পর্কে ভুল বার্তা যেতে পারে সমাজে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইনজ্ঞ, সমাজ-গবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নারী নেতৃত্ব এ ব্যাপারে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা যথার্থ। আটক অভিযুক্তদের লৈঙ্গিক পরিচয় যেভাবে সামনে আনা হচ্ছে, তা কেবল নারীবিরোধী নয়, আইন-বহির্ভূতও। এতে করে নারীর প্রতি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি ছাড়াও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সমাজে ভুল বার্তা যাবে। একই সঙ্গে আমাদের সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও মুক্তির বিরুদ্ধে যেসব মহল ক্রিয়াশীল তারাও নেতিবাচক প্রচারণার সুযোগ পাবে।

আমরা জানি, আমাদের সংবিধানে উল্লেখ আছে আইন মোতাবেক ছাড়া কারও জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পদ, সুনাম এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। অথচ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই যেন তাদের ‘অপরাধী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চলছে। তারা নারী বলেই কি এমন বৈষম্য? মনে রাখতে হবে, আইনের চোখে সবাই সমান। অভিযুক্ত ব্যক্তি নারী না পুরুষ এটি জরুরি নয়, জরুরি হলো- অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই। এও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিচারের আগেই সমাজের চোখে অপরাধী বানানোর অপচেষ্টাও নিঃসন্দেহে বেআইনি। এমনকি আইনের নামেও এমন বেআইনি তৎপরতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমরা মনে করি, গ্রেপ্তারকৃত যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা অভিযোগ হিসেবেই সংবাদমাধ্যমে জানানো উচিত। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের স্বার্থেই বিচারের আগেই একজন অভিযুক্তকে দোষী হিসেবে আখ্যায়িত করা থেকে বিরত থাকা উচিত। একই সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযুক্ত নারীদের বিরুদ্ধে অশোভন প্রচারণাও বন্ধ করা জরুরি। অভিযুক্ত ব্যক্তি যাতে আইনগত সব সুযোগ-সুবিধা পান, নজর দিতে হবে সেদিকেও। একটা অন্যায়ের প্রতিকার করতে গিয়ে আরও অন্যায়ের যেন সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করার দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের সবার। লিঙ্গ সংবেদনশীলতার ব্যাপারে সরকারের দায়িত্বশীলরাই যদি সচেতন না থাকেন তাহলে সমাজে তার নেতিবাচকতাই পুষ্ট হবে। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কাউকেই হেয় প্রতিপন্ন করার অবকাশ নেই। এমনটি দায়িত্বশীলতা ও আইনের বিরুদ্ধাচরণ। সমাজে গঠনমূলক জীবনযাপনের পথ মসৃণ করার দায় কমবেশি সবারই। মনে রাখতে হবে, সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত নারীর মর্যাদার ব্যাপারে সচেতন থাকা। নারীর প্রতি অমর্যাদা থেকেই বিবিধ নারীবিরোধী অপরাধের জন্ম হয়।

আমরা দেখতে চাইব, দায়িত্বশীল মহল এ ব্যাপারে আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে। প্রসঙ্গত, নারীর জন্য মর্যাদা, অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠা সমকালের সম্পাদকীয় নীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। আমরা সবাইকে নিয়ে নারীর জন্য একটি সমতাভিত্তিক দেশ ও বিশ্ব গড়ার পথে আরও এগিয়ে যেতে চাই। নারীর সেই অনিঃশেষ সংগ্রামে নারী-পুরুষ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি