শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

রাজনীতিক-আমলা বিরোধ কাম্য নয়

বরিশাল নগরীতে বুধবার মধ্যরাত থেকে যা ঘটছে, সেটা শুক্রবারের সমকালে ‘তুচ্ছ ঘটনা থেকে তুলকালাম’ আখ্যা দেওয়ার মধ্যে অত্যুক্তি থাকতে পারে না। বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে ব্যানার-ফেস্টুন ‘পরিস্কার’ করা নিয়ে সিটি করপোরেশন কর্মীদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে দায়িত্বরত আনসারদের ‘বিরোধ’ তুচ্ছ ঘটনা ছাড়া আর কী হতে পারে? এ ঘটনার জল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে চড়াও হওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে পরস্পরবিরোধী হামলা এমনকি গুলির অভিযোগ পর্যন্ত গড়ানো কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। বাস্তবে ঘটনা সেখানেও থেমে থাকেনি। আমরা দেখেছি, সিটি করপোরেশনসহ বরিশালের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পক্ষ এবং জনপ্রশাসন কার্যত ‘মুখোমুখি’ দাঁড়িয়ে গেছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার পর দুটি মামলা হলেও পরিস্থিতি ঠিক আইনি পথে চলছে না। জনপ্রশাসন কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ যেমন বিবৃতি প্রদান করেছে, তেমনই বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলন হয়েছে।

এ ছাড়া বরিশাল আওয়ামী লীগের কয়েকটি অঙ্গ সংগঠন ছাড়াও সিটি করপোরেশন কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বরিশাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হলেও পরে বিজিবি মোতায়েনের মতো ‘জরুরি পরিস্থিতি’ সৃষ্টি হয়েছিল। শনিবার সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে- বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা আবর্জনা সংগ্রহ বন্ধ করেছে। ফলে জনজীবনে দেখা দিয়েছে বিপত্তি। এমন আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে এ বিরোধের জল আরও অনেক দূর গড়াতে পারে।

বস্তুত সিটি করপোরেশনের পক্ষে রাতের বেলা ব্যানার ‘পরিস্কার’ করতে যাওয়া এবং সেখানে উপজেলা প্রশাসনে দায়িত্ব পালনরত আনসারদের বাধা প্রদান- কোনোটিই ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা হতে পারে না। বরিশালের এই বিশৃঙ্খলাকে ‘বিচ্ছন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখারও অবকাশ নেই। আমাদের মনে আছে, গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহেই দেশ পরিচালনায় আমলাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে সোমবার জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ‘কঠোর সমালোচনা’ করেছিলেন। সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে আমলারা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে- এমন আলোচনা ও সমালোচনাও অনেক দিন ধরে জনপরিসরে শোনা যাচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের পক্ষে আরও বিভিন্ন সময়ে ‘প্রশাসনের বাড়াবাড়ি’ নিয়ে অভিযোগ উঠতে দেখা গেছে। বিশেষত গত বছর দেশের কোথাও কোথাও ‘অনিয়ম ও দুর্নীতি’ নিয়ে জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের মনে আছে, গত বছর জুন মাসে সমকালেই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর তার আগের তিন মাসে শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল- জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রশাসনের বিরোধের জের ধরে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। এমনও দেখা গেছে- জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় যতটা সক্রিয়; মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে ততটাই নিষ্ফ্ক্রিয়।

আমরা মনে করি, জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে বিরোধ সারাদেশেই যেভাবে ধূমায়িত হয়ে উঠছে; বরিশালে তার স্ম্ফুলিঙ্গ দেখা গেল মাত্র। এতে রাজনীতি ও প্রশাসনে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, তা নিমজ্জিত হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়া মাত্র। আমরা দেখতে চাইব, আইন নিজের গতিতে চলছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও এগিয়ে আসতে হবে বিরোধ নিরসনে। মনে রাখা জরুরি, জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি যদি নিজ নিজ এখতিয়ার মেনে চলেন, তাহলে কোনো গোলযোগই ঘটে না। অন্যদিকে জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের এমন মুখোমুখি অবস্থান রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও সুশাসনের বড় অন্তরায়। বিবৃতি কিংবা বক্তব্যের ক্ষেত্রেও উভয় পক্ষকে আমরা সংযত থাকার আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি, উভয় পক্ষই রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ শুধু নয়; পরস্পরের পরিপূরকও বটে। ভুলে যাওয়া চলবে না, জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রশাসন, উভয়ই জনগণের সেবক মাত্র। ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি