বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৪০ অপরাহ্ন

চিন্তা-ভাবনায় সীমাবদ্ধ পিএসসির মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগ

নিউজ ডেস্ক :: করোনা মহামারির পর সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বেশ কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে একসঙ্গে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। এ অবস্থায় সমন্বিতভাবে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে আবারও। কিন্তু একটি আলাদা কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে তৃতীয় (১১-১৬তম গ্রেড) ও চতুর্থ শ্রেণির (১৭-২০তম গ্রেড) কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি এখনো সরকারের চিন্তা-ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পিএসসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।

প্রশাসনে প্রায়ই আড়াই থেকে তিন লাখের মতো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদ খালি থাকে। এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পছন্দের লোক, অর্থের বিনিময়ে নিয়োগসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ২৭ মে সরকারি চাকরিতে বেতন কাঠামোর ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডের শূন্যপদ জরুরিভাবে পূরণে কমিশন গঠন করা যায় কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

আট সদস্যের ওই কমিটির সভাপতি করা হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তখনকার জ্যেষ্ঠ সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. শামসুল আরেফিনকে। কমিটির সদস্য ছিলেন অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা।

তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির শূন্যপদ জরুরিভিত্তিতে পূরণের জন্য আলাদা কমিশন গঠনের বিষয়ে বিদ্যমান বিধিবিধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয় এই কমিটিকে। কিন্তু ওই বছরের ২৯ জুন অবসরে যান শামসুল আরেফিন। নতুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) শেখ মুজিবুর রহমান এসে প্রতিবেদনটি সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের কাছে জমা দেন। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

ওই কমিটি তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির শূন্যপদে নিয়োগের জন্য বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মতো একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করে। কিন্তু আলাদা কমিশন গঠনের পক্ষে ছিল না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারা চেয়েছিল পিএসসিকে এ দায়িত্ব দিতে। এজন্য এ সংক্রান্ত একটি সার-সংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও পাঠানো হয়। পরে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয় পিএসসিকে। পিএসসিও কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্ব নিতে একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ওই সময় পিএসসির চেয়ারম্যান ছিলেন মোহাম্মদ সাদিক। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর তার মেয়াদ শেষ হয়।

পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পিএসসির দেওয়া প্রস্তাব যাচাইয়ের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বিষয়টি আর এগোয়নি।

এখন সরকারি কর্ম কমিশনের ১৯৭৭ সালের অধ্যাদেশ যুগোপযোগী করে নতুন আইন করা হচ্ছে। আইনটি চূড়ান্ত হলে কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্ব পিএসসিকে দেওয়ার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এদিকে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের বয়সের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২১ মাসের ছাড় দিয়েছে সরকার। ১৯ আগস্টের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে যাদের চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩০ বছর পার হয়েছে বা হচ্ছে, তারা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জারি করা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের যোগ্য হবেন।

পরে ২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সে ছাড়ের ভিত্তিতে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে শূন্যপদ দ্রুত পূরণের নির্দেশনা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই প্রেক্ষাপটে কিছুদিন ধরে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে (শুক্র ও শনিবার) সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপাকে পড়েন চাকরিপ্রার্থীরা। গত ৮ অক্টোবরও একই দিনে মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠান চাকরির পরীক্ষা নেয়। এর মধ্যে কয়েকটি পরীক্ষা হয় একই সময়ে।

করোনার কারণে দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এখন সবাই একসঙ্গে পরীক্ষা নিচ্ছে জানিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দৈনিক বাঙলার জাগরণ নিউজকে বলেন, পরীক্ষা নেওয়ার একটি বোর্ড বা একটি ফোরাম থাকলে বিষয়টি ভিন্ন ছিল। কিন্তু তেমন কোনো ফোরাম নেই। তাই সমন্বয় করা হবে কীভাবে?

‘পিএসসিকে আরও সম্প্রসারণ করে আরেকটি ইউনিট করে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ প্রক্রিয়া করা যায় কি না, এটা নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। এটা হলে তখন আমরা ভিন্ন ভিন্ন দিনে পরীক্ষা নিতে পারতাম।’

এ বিষয়ে পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক দৈনিক বাঙলার জাগরণ নিউজকে বলেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগের কাজ পিএসসি করে না। যদি এটা করতে হয় তাহলে আইন ও বিধিগুলোর খসড়ায় সংশোধন আনতে হবে। এজন্য আমরা এ বিষয়ে সুপারিশ করে আসছিলাম। পাঠিয়েছিলাম খসড়া। পরে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। এরপর আবার পাঠানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে আমি সেটা রেখে আসছি।

নাম প্রকাশ করে না করার শর্তে পিএসসির একজন কর্মকর্তা বলেন, কর্মচারী নিয়োগ পিএসসির কাছে আনার জন্য অনেকগুলো বিষয় আছে। আছে জটিলতা। প্রথমে পিএসসির জুরিসডিকশন (এখতিয়ার) ঠিক করতে হবে। জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের নিয়োগগুলো আবার আলাদা। কিছু টেকনিক্যাল ব্যাপার আছে, যেগুলো কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য, সবার জন্য নয়। এক্ষেত্রে কী হবে?

আরেক কর্মকর্তা বলেন, আগে কর্মচারীদের নিয়োগও পিএসসি দিতো। তখন পিএসসি-১ ও পিএসসি-২ ছিল। সরকার চাইলে পিএসিসির মাধ্যমে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব।

পিএসসির প্রস্তাব যাচাই কমিটির সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইনটি নতুন করে করা হচ্ছে। সেটি পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। এখন আইন পাস হওয়ার প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে- এটা আলোচনার সময় বিষয়টি (কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্ব) উঠতে পারে। তখন কোনো একটা নির্দেশনা আসতে পারে। সেজন্য পিএসসির মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগের বিষয়টি ধীরগতিতে চলছে। যেহেতু সামনে আইনটি আছে, তাই আইন পাস হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হচ্ছে। আইন পাস হলে এর ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর আগে এ বিষয়ে কিছু করা যাচ্ছে না।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পিএসসি আইনে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বললেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মনে করে সেটার সেভাবে দরকার নেই। সব ধরনের নিয়োগই পিএসসির আওতাভুক্ত। সব নিয়োগের ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাবান। ‘দ্য বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (কনসালটেশন) রেগুলেশন, ১৯৭৯’-এ বলে দেওয়া হয়েছে এ বিষয় কনসালটেশনের জন্য পিএসসিতে আসা দরকার। এ রেগুলেশনটিরও সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে। এগুলো হলে এর আলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিলাম, দেখা গেলো নতুন যে আইন হলো সেটার সঙ্গে যাচ্ছে না। নতুন নির্দেশনা এলো আইনে।

কমিটির আরেক সদস্য বলেন, পিএসসিকে কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়ার পরও কথা থাকে। এমনিতেই বিসিএসগুলো নিয়ে তাদের নাভিশ্বাস। এর ওপর নতুন করে দায়িত্ব দিলে সেটা তারা সামলাতে পারবে কি না, এটাও দেখার বিষয়। তখন আবার না পিএসসি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তিনি আরও বলেন, ডেসপাস রাইটার তিনটি গ্রেডে আছে। ১৭, ১৮ ও ১৯ গ্রেডে। এ পদে নিয়োগের জন্য কোন গ্রেডে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও আছে ভিন্নতা। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্কেল সাধারণত দশম গ্রেডে। ১১ ও ১২তম গ্রেডেও আছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এক্ষেত্রেও নিয়োগের কী হবে? ফলে রয়েছে নানা ধরনের জটিলতা।

এএসএম/

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি