মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন

তিহার জেল থেকে কেরানীগঞ্জ কারাগার ভারত সরকার চাইলে কারামুক্ত হবেন বাদল ফরাজি

নিউজ ডেস্ক :: বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের কাছে ১৭ নম্বর ফারুকি রোডের বাসিন্দা আবদুল খালেক ফরাজি ও শেফালি বেগমের ছেলে বাদল ফরাজি। টি এ ফারুক স্কুলের অষ্টম শ্রেণি পাস বাদলের ইচ্ছা ছিল তাজমহল দেখার। আর সেই ইচ্ছা পূরণের জন্যই ভারতে যাওয়া।

২০০৮ সালের ১৩ জুলাই দুপুরে বেনাপোল ইমিগ্রেশন কার্যালয়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করে ভারতের হরিদাসপুর সীমান্তে প্রবেশের পরই বাদল ফরাজিকে আটক করে বিএসএফ৷ বাদল সিং নামে এক খুনের মামলার আসামি ভেবে তাকে আটক করে তারা। বাদল ফরাজি হিন্দি কিংবা ইংরেজি কোনো ভাষায় কথা বলতে পারতেন না। এজন্য বিএসএফ কর্মকর্তাদের তিনি বোঝাতে পারেননি যে, খুনের অভিযোগে যে বাদল সিংকে খোঁজা হচ্ছে তিনি সেই ব্যক্তি নন ৷ এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

যদি আল্টিমেটলি বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে হয় তা হলে ভারত সরকারকে নিতে হবে। আমাদের দেশে বাদল ফরাজিকে আনা হয়েছে একটি চুক্তির মাধ্যমে। এটি হলো বন্দিবিনিময় চুক্তি। সাজাপ্রাপ্ত আসামি ওখানে (ভারতে) নয় বাংলাদেশে জেল খাটবে এটা হলো চুক্তির মূল মর্ম। এখন যদি ওখানে (ভারতে) সাজা হয় এখানে (বাংলাদেশে) এনে মুক্তি দেন তার কোনো সুযোগ নেই।

২০০৮ সালের ৬ মে দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধাকে খুনের অভিযোগে বাদল সিং নামে এক ব্যক্তিকে খুঁজছিল পুলিশ। তাকে ধরতে সীমান্তেও সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু শুধু দুজনের নাম এক হওয়ায় বাংলাদেশি নাগরিক বাদল ফরাজিকে আটক করে বিএসএফ। পরে ওই খুনের অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগ দায়ের করা হয় বাদলের বিরুদ্ধে।

অপরাধ না করেও হত্যা মামলায় ভারতের আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় বাদল ফরাজির। সে দেশের কারাগারেই তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। একপর্যায়ে কারাগারে ইংরেজির শিক্ষকতা শুরু করেন। সহবন্দিদের ইংরেজি শেখাতেন। স্নাতকের পর আটটি ডিপ্লোমা কোর্সও করেন। বাগেরহাটের ছেলে বাদল গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সে; এখন তার বয়স ৩০ পেরিয়ে গেছে।

২০১৫ সালের ৭ আগস্ট বাদল ফরাজিকে দিল্লির সাকেত আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করা হলেও নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে। রায়ের পর থেকে তিহার জেলের ৩ নম্বর সেলে দিন কেটেছে তার। সেখানে বন্দিদের কাউন্সেলিং করতে যাওয়া মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের সঙ্গে কথা হয় বাদল ফরাজির। সব শুনে তাকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেন রাহুল।

‘জাস্টিস ফর বাদল’শীর্ষক একটি আবেদনে স্বাক্ষর অভিযানও শুরু করেন তিনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাদলের দণ্ডের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তোলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। রাহুল বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করলে হাইকমিশন সরকারের কাছে চিঠি পাঠায়। এরপরই বাদলকে ছাড়াতে দুই দেশের মধ্যে চিঠি চালাচালি শুরু হয়।

বাদল ফরাজি নির্দোষ জানা সত্ত্বেও আইনি কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না। বহিঃসমর্পণ চুক্তির অধীনে তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। সেই চুক্তিতে রয়েছে, এক দেশের বন্দি আরেক দেশে সাজাপ্রাপ্ত হলে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার পর সেই সাজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সভার প্রস্তাবে বাদলকে ‘নির্দোষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১০ বছর কারাবাসের পর বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে বাদল ফরাজিকে দিল্লি থেকে ঢাকায় আনা হয়। ২০১৮ সালের ৭ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি দল জেট এয়ারওয়েজের একটি বিমানে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে আসে। সেখান থেকে সরাসরি কেরানীগঞ্জের (ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার) কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

আইনজীবীর কাছ থেকে জানা গেছে, দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে তার স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে দেখা করা এবং কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

বাদল ফরাজিরা পাঁচ ভাই-বোন। বাবা বেঁচে নেই ৷ তার বড় বোন আকলিমা আক্তারই এখন সংসার দেখাশোনা করেন বলে জানা গেছে।

কারা সূত্র জানায়, তাকে বন্দি বিনিময় চুক্তির অধীনে ফেরত আনা হয়েছে৷ তাই সাধারণ নিয়মে তাকে বাংলাদেশের কারাগারেই বাকি শাস্তি ভোগ করতে হবে ৷ তাই তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে।

গত রমজান মাসে সরকার একটি ঘর দিয়েছে আমাকে। সেই ঘরে থাকি আর একটা বিধবা ভাতার কার্ড দিয়েছে। সেই ভাতা তুলে খরচ করি, সরকারি মেডিকেলের ওষুধপত্র যা দেওয়া হয় তা খাই। আল্লাহ যেন আমার ছেলেটাকে মুক্ত করে দেন- এটাই চাওয়া বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন শেফালী বেগম।

জানা গেছে, কারাগার থেকে মুক্তি মিলতে পারে ভারতে বেড়াতে গিয়ে খুনের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত বাংলাদেশি যুবক বাদল ফরাজির। তাকে মুক্তি দিতে ভারতের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চিঠি পাঠানোর সব প্রক্রিয়াও হয়েছে বলে জানান আইনজীবী।

মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে যা কিছু করতে হবে তা ভারত সরকারকেই করতে হবে। তবে সেটা দুই দেশের আন্তরিকতার মাধ্যমে করতে হবে। উদ্যোগটি দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাস্তবায়ন করতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। বন্দি বিনিময় চু্ক্তিতে যদি কোনো প্রভিশন যুক্ত করতে হয় সেটা করতে হবে দেশের আইন মন্ত্রণালয়কে- মতামত দেন আইনজীবীরা।

এদিকে ২০১৯ সালে তার (বাদল ফরাজির) মুক্তির বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না না তা জানতে চেয়ে হাইকোর্টের জারি করা রুলের বিষয়ে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও রিটকারীদের আইনজীবীরা জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন।

বাদল ফরাজির বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে জটিলতা আছে। যখন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান রেজাউল হক ছিলেন তখন এটার ব্যাপারে তৎপরতা ও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পরে তো আর কোনো অগ্রগতি নেই।

তিনি বলেন, যদি আল্টিমেটলি বাদল ফরাজির মুক্তির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে হয় তা হলে ভারত সরকারকে নিতে হবে। আমাদের দেশে বাদল ফরাজিকে আনা হয়েছে একটি চুক্তির মাধ্যমে। এটি হলো বন্দিবিনিময় চুক্তি। সাজাপ্রাপ্ত আসামি ওখানে (ভারতে) নয় বাংলাদেশে জেল খাটবে এটা হলো চুক্তির মূল মর্ম। এখন যদি ওখানে (ভারতে) সাজা হয় এখানে (বাংলাদেশে) এনে মুক্তি দেন তার কোনো সুযোগ নেই।

মনজিল মোরসেদ জানান, ওখানে বলা হচ্ছিল বাদল ফরাজির সাজাটাই ছিল একটা মিথ্যা সাজানো মামলায়। যদিও সেটা টপকোর্ট পর্যন্ত সাজাটা বহাল রয়েছে। তখন আমি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মানবাধিকার কমিশনকে বলেছিলাম, ওখানে এই জাজমেন্টের ব্যাপারে একটা আবেদন (আপিল অথবা রিভিউ) ফাইল করার জন্য। সাজা মওকুফের বিষয়টি যদি ওঠে সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সাজা মওকুফের ব্যবস্থা করতে পারে। এই দুটো পদ্ধতি ছাড়া মুক্তির আর কোনো অল্টারনেটিভ নেই।

বাদল ফরাজির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার জাগো নিউজকে বলেন, এখানে ভারত সরকারের তাকে ক্ষমা ঘোষণা করতে হবে। না হয় ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে খালাস পেতে হবে, দুটোর একটা। এছাড়া মাঝখানে কিছু নেই।

বাংলাদেশ কী করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ চাইলেও তাকে খালাস করতে পারবে না।

রাষ্ট্রপতি তাকে ক্ষমা করতে পারবেন কি না জানতে চাইলে বাশার জানান, অপরাধ ওই দেশে (ভারতে) সংঘটিত হয়েছে, সে কারণে বাংলাদেশ সরকারের কিছু করার নেই। ক্ষমা করতে হলে ভারতের সরকারকেই করতে হবে। এখানে শুধু দুই রাষ্ট্রের আন্তরিকতাই যথেষ্ট হবে না বলেও জানান তিনি।

রিটকারীদের পক্ষের ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম (জেডআই) খান পান্না জাগো নিউজকে বলেন, বাদল ফরাজির মতো মিথ্যা মামলায় সাজা হওয়ার ঘটনা দেশেও অহরহ ঘটছে, মানুষ কারাগারে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, ‘বাদল ফরাজি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। তিনি এখানে গণশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষকতা করেন। ’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাদল ফরাজি নির্দোষ জানা সত্ত্বেও আইনি কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া যাচ্ছে না। বহিঃসমর্পণ চুক্তির অধীনে তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। সেই চুক্তিতে রয়েছে, এক দেশের বন্দি আরেক দেশে সাজাপ্রাপ্ত হলে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার পর সেই সাজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হবে।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের যাবজ্জীবন ১৪ বছর আর বাংলাদেশে ৩০। ভারতের হিসাবে এতদিনে তার সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুই রাষ্ট্রের চিঠি চালাচালিতে আর কত সময় বাদলকে জেলে থাকতে হবে তা কেউ জানে না।

‘বিনা অপরাধে’ ভারতের কারাগারে প্রায় ১০ বছর বন্দি থাকার পর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এর পরে এ বিষয়ে রিট আবেদন করা হয়। ওই রিটের শুনানি নিয়ে বাদল ফরাজিকে আদালতে কেন হাজির করা হবে না তা জানতে চেয়ে ২০১৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। এক সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব (সুরক্ষা বিভাগ), পররাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), আইজি প্রিজন, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।

ওই রুলের বিষয়ে এখনো শুনানি হয়নি। এটি শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

বাদল ফরাজির মা শেফালী বেগম জাগো নিউজকে বলেন, কেরানীগঞ্জের (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগারের) জেলার আমাদের বলেছেন, তারা একটি কাগজ প্রস্তুত করে সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে জমা দিয়েছেন। সেটি ভারতে পাঠানো হয়েছে। ভারত থেকে ওই দেশের আদালত কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে তার পরে বাদল ফরাজির মুক্তি হবে কি না জানা যাবে।

তিনি বলেন, হাইকোর্টে রিট করার পর আইনজীবীদের সাথে দেখা করতে একবার ঢাকা গিয়েছিলাম। এখন আর শরীর চলে না, চলতে ফিরতে কষ্ট হয়। বাদল ফরাজি ভারতের জেলে থাকতে ওর বাপ মারা গেছে। এখন বড় মেয়ের সঙ্গে আছি। সে সব দেখাশোনা করে। বাদল তো আমার মেজো ছেলে। বড় তার বোন। সেই রান্না করে খাবার নিয়ে আসে। ছোট একটা ছেলে আছে গাজীপুরের সফিপুর বউ নিয়ে থাকে। আমার কোনো খোঁজ নেয় না।

তিনি আরও বলেন, গত রমজান মাসে সরকার একটি ঘর দিয়েছে আমাকে। সেই ঘরে থাকি আর একটা বিধবা ভাতার কার্ড দিয়েছে। সেই ভাতা তুলে খরচ করি, সরকারি মেডিকেলের ওষুধপত্র যা পাই তা খাই। আল্লাহ যেন আমার ছেলেটাকে মুক্ত করে দেন- এটাই চাওয়া বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন শেফালী বেগম।

নিউজটি শেয়ার করুন

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগীতায় :বাংলা থিমস| ক্রিয়েটিভ জোন আইটি