সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

অসাম্প্রদায়িক উৎসব

সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, জন্মাষ্টমী, শারদীয় দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠান কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উদযাপিত হয় প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব।

শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বাঙালির কাছে এই পূজা চিরায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক অনুপম প্রীতিময় আনন্দ উৎসব।

অশুভ ও অপশক্তির পরাজয় এবং শুভ শক্তির জয়, সত্য ও সুন্দরের আরাধনায় সর্বজীবের মঙ্গল কামনায় শারদীয় দুর্গাপূজার প্রধান লক্ষ্য। অশুভ ও আসুরিক শক্তি দমনের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার, সত্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, সব মানুষের সম-অধিকার নিশ্চিতকরণ, মানুষের মধ্যকার সব ধরনের বৈষম্য বা ভেদাভেদ ও অন্যায়, অবিচার দূরীকরণ এবং অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, হানাহানিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সমাজ গঠন করার শিক্ষালাভই দুর্গোৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য।

শারদীয় দুর্গাপূজা সমাজকে অসহিষ্ণুতা, হিংসা, বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত করে মানুষের মধ্যে ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করে। ঐক্যবদ্ধ করে বাঙালিকে।

এক মায়াবী বন্ধনে জড়িয়ে রাখে। উদ্বুদ্ধ করে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে। সবার মাঝে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করে। দুর্গাপূজার শুভ্র ও আনন্দ জাগানিয়া পরশ শুধু বাঙালি সনাতন ধর্মানুসারীদেরই নয়, এর চিরায়ত ঐকতান স্পর্শ করে প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়কে।

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যে অনাবিল আনন্দ সবার মনের মাঝে জেগে ওঠে, তা বাঙালির প্রতিটি গৃহকে আলোকিত করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মঙ্গল ও হিত কামনায়।

সব ধর্মের মূল বাণী হচ্ছে সৃষ্টির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা, সমগ্র জীবের কল্যাণ সাধনই ধর্মের মূল লক্ষ্য, কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণ সাধন নয়। এই চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের সুখ-শান্তি কামনায় এবং সর্বজীবের মঙ্গলার্থে আবহমান কাল ধরে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে নানা

উপচার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে শারদীয় দুর্গাপূজা, আরাধনা করে দেবী দুর্গার। উৎসবমুখরতার মধ্য দিয়ে সব ধরনের হীনতা, সংকীর্ণতা ও ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধর্ম যার যার উৎসব সবার—এই চেতনাকে ধারণ করে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করে এবং আনন্দ উৎসবে অংশ নেয়। সব বাঙালি মিলিত হয় অভিন্ন মোহনায়, অভিন্ন চেতনায়।
পূজার ধর্মীয় অংশটুকু হিন্দুদের, কিন্তু মেলা, উৎসব ও আপ্যায়নে অংশগ্রহণ এবং আনন্দ উপভোগ করে সবাই। সবার

অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে শারদীয় দুর্গাপূজা পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে, সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায়, অন্যতম জাতীয় উৎসবে। ঐক্য ও সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবে এই উৎসব রূপ লাভ করে সম্প্রীতিময় আনন্দযজ্ঞে। সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ এবং ঐক্যসূত্রে গ্রথিত হয় সব মানুষের হৃদয়; দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। পূজা থেকে উৎসবে রূপান্তরের এই যে প্রক্রিয়া, এটি বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক সত্তার চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ।

অতীত থেকেই দুর্গাপূজা উৎসবাকারে পালিত হয়ে আসছে সবার সম্মিলিত প্রয়াসে। সবার মঙ্গল ও হিত কামনায় এমন বৃহৎ আয়োজন খুবই গুরুত্ব বহন করে। পূজার সময় মন্দিরে মন্দিরে ভক্তিমূলক গান, চণ্ডীপাঠ, অর্চনা, আরতি, ভক্তদের শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং সেই সঙ্গে কোলাকুলি, প্রণাম, আশীর্বাদ, মেলা ইত্যাদি দুর্গাপূজাকে ধর্মীয় আবেশে আনন্দঘন করে তোলে। দুর্গাপূজা মানুষে-মানুষে মেলবন্ধন সৃষ্টি করে। সৃষ্টি করে মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রীতিময় ও কল্যাণময় সম্পর্ক। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি

দুর্গাপূজা সর্বস্তরের মানুষের মাঝে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ঐক্য সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সবার সহাবস্থান আর ঐক্যের মেলায় পরিণত হয় পূজার মন্দির। প্রকাশিত হয় বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এ জন্যই শারদীয় দুর্গাপূজা সামাজিক সম্প্রীতি, মহামিলন এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার চিরন্তন উৎসব। সম্প্রীতিবিধ্বংসী কোনো প্রচেষ্টা দুর্গাপূজার সর্বজনীনতাকে বিনষ্ট করতে পারে না। বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূলে গ্রথিত ঐকতানের কাছে তা পরাভূত হয়। আপামর জনতা দুর্গোৎসবে শামিল হয়ে উৎসবের আমেজে যে ঐক্যচেতনায় বাঁধা পড়ে, তা ছিন্ন করার ক্ষমতা কারোর নেই। কোনো ঠুনকো আঘাতে এই বন্ধন কোনো দিন ছিন্ন হবে না।

দুর্গাপূজা যদিও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিন্দুদের, কিন্তু মূলবাণী সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা। দুর্গোৎসবে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক সামাজিক বন্ধন ও অসাম্প্রদায়িক পরিচয় ফুটে ওঠে, ভ্রাতৃত্ববোধের এক নতুন আবহ তৈরি হয়। দেবীর যুদ্ধরত রূপ লোকশিক্ষার একটি দৃষ্টান্ত। এটি

হচ্ছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির যুদ্ধ; অন্যায়, অসত্য ও অনাচারের বিরুদ্ধে ন্যায়, সত্য ও সদাচারের সংগ্রাম। দেবীর বন্দনার প্রেক্ষাপট হলো অন্তরের আসুরিক শক্তির বিনাশ। দুর্গাপূজা হচ্ছে শক্তি অথবা ঐশ্বরিক শক্তির আরাধনা। দেবীর ‘দশ হাত’ ঐক্য বা সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, অন্যায়কে প্রতিহত করার শিক্ষাই দেবীর প্রতিমা থেকে শিক্ষণীয়। সুতরাং দুর্গাপূজা শক্তি, সংহতি বা ঐক্যের প্রতীক।

ধর্মীয় আচার যখন কোনো একটি জাতির জীবনে উৎসবের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়, তখন তা ধর্মীয় চেতনার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে অগ্রবর্তী সমাজকাঠামোর ভিত্তিমূলের চলমান সোপান। বাঙালির জীবনে শারদীয় দুর্গাপূজা তেমনি এক বহমান অসাম্প্রদায়িক চেতনসত্তার প্রতিরূপ।

বাঙালি যে অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তা প্রতিবছরই প্রমাণিত হয় শারদীয় দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে। এ কারণেই শারদীয় দুর্গাপূজা হচ্ছে সম্প্রীতি রক্ষার এক মহামিলনধর্মী অসাম্প্রদায়িক উৎসব।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সংস্কৃত বিভাগ; ট্রাস্টি, সনাতন ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট; উপদেষ্টা শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র; সিনেট সদস্য ও সাবেক প্রাধ্যক্ষ জগন্নাথ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: