শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০৩ অপরাহ্ন
মাসের শেষের বেতনটা হাতে পাওয়ার আগেই কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ভোরের আলো ফোটার আগেই অফিসের বাস ধরতে নেমে পড়া মাঝবয়সী এক বাবা হিসেব করছেন—এই মাসে বাড়ি ভাড়া বাবদ ২২ হাজার টাকা, বড় ছেলের কোচিংয়ের ফি বাবদ ১৮ হাজার টাকা, ছোট মেয়ের স্কুলের বিল, নিত্যপণ্যের খরচ—হাতে আর কিছুই থাকে না। বছর শেষে বোনাসটা হয়তো ব্যাংকের ঋণের কিস্তিতে চলে যায়। এই চিত্রটি শুধু কোনো একজনের নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রমশ সংকুচিত মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
মধ্যবিত্ত মানে কেবল আয়ের একটি পরিসর নয়—এটি একটি সামাজিক অবস্থান, একটি মানসিকতা, একটি স্বপ্ন। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের কোনো সর্বজনস্বীকৃত আয়ভিত্তিক সংজ্ঞা নেই। বিভিন্ন গবেষণায় আয়, ভোগক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি বহুল ব্যবহৃত শ্রেণিবিন্যাসে দৈনিক ২ থেকে ২০ ডলার আয়কে মধ্যবিত্তের বিস্তৃত পরিসরে ধরা হয়। আবার ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট আয়ভিত্তিক পরিমাপে (দৈনিক মাথাপিছু ২ থেকে ৩ ডলার আয়) প্রায় ৩৪ মিলিয়ন মানুষকে মধ্যবিত্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই সময়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই হার ২৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালে ৩৩ শতাংশে পৌঁছানোর কথা ছিল। মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করার এই ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিই বলে দেয়, ‘মধ্যবিত্ত’ আসলে একটি ভাসমান ও ভিন্নমাত্রিক শ্রেণি। কারও আয় আছে, চাকরি আছে, সামাজিক অবস্থান আছে—কিন্তু নেই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
মধ্যবিত্তের স্বপ্ন—শিক্ষা, চাকরি, নিজের বাড়ি, সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা—সহজ ও সর্বজনীন। একটি ডিগ্রি ছিল একসময় সোনার টিকিট; এখন তা নিছক শুরু মাত্র। মধ্যবিত্ত বাবা-মা নিজেদের ভোগ কমিয়ে সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ান, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করান, কিংবা বিদেশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখেন। এই আকাঙ্ক্ষাগুলোই মধ্যবিত্তকে চালিত করে—এবং একই সঙ্গে তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, আয়ও বাড়ে—কিন্তু ব্যয় বাড়ে তার চেয়েও দ্রুত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৯.০২, ৯.৭৩ ও ১০.০৩ শতাংশ; বিপরীতে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.০৪, ৭.৭৪ ও ৮.১০ শতাংশ। অর্থাৎ নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয়ের সক্ষমতা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
শুধু নিত্যপণ্য নয়—শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন—প্রতিটি খাতেই বাড়তি চাপ। বাড়িভাড়ার চাপ তো আছেই। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (CAB) তথ্য অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ভাড়া বাবদ খরচ করেন, আর গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে—অভিভাবকদের ওপর কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের ব্যয় ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে টিবিএস-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী মাসে তিনটি কোচিং সেন্টারে প্রায় ৯ হাজার টাকা খরচ করে—যা তার স্কুল ফি-র তিনগুণ।
আধুনিক জীবনের ‘সুবিধা’গুলো এখন কিস্তির বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফ্ল্যাট, গাড়ি ও নানা ভোক্তা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ভোক্তা ঋণ বছরভিত্তিক ২৬ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে একই সময়ে মোট ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৮ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক—অটো লোন বেড়েছে ৫৮.৪৩ শতাংশ এবং হাউজিং লোন বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুন নাগাদ মোট ভোক্তা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১.৭৩ লাখ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মন্দার সময় বাড়তে থাকা ভোক্তা ঋণ পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—মধ্যবিত্ত কি নিজের ভবিষ্যৎ আয়ের একটি অংশ আগেই খরচ করে ফেলছে?
যে শিক্ষা মধ্যবিত্তের সামাজিক উন্নতির প্রধান সিঁড়ি, সেই শিক্ষাই কেন পরিবারকে ঋণনির্ভর করছে? মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সন্তানের শিক্ষা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। কিন্তু এই অগ্রাধিকারই এখন সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ। ঢাকার একটি পরিবারের উদাহরণে দেখা যায়, দুটি সন্তানের শিক্ষাব্যয় মাসিক ২৩ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা বাড়িভাড়া ও খাদ্য ব্যয়ের পর তৃতীয় বৃহত্তম খরচ। অথচ স্কুল ফি-র চেয়ে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনিতে ব্যয় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি।
চাকরির বাজারও বাড়াচ্ছে অনিশ্চয়তা। ২০২৫ সালজুড়ে চাকরির বাজারে তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। একটি সরকারি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ২৪৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ১ লাখ কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিকল্প হিসেবে অনেকে অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে গেছেন। বেসরকারি শিল্পখাতেও কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের ঘটনা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসবের ফলে চাকরির স্থায়িত্ব কমছে, আর একটি ডিগ্রি আর আগের মতো নিরাপত্তা দেয় না। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত পরিবারের নতুন বাস্তবতা—শিক্ষা শেষ করলেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়।
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু আয়-ব্যয়ের ব্যবধান নয়; বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা হারানোর ভয়। আগে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ছিল ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি; এখন অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে সঞ্চয় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি না হয়ে মাসের ঘাটতি পূরণের শেষ অবলম্বনে পরিণত হচ্ছে। সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখতে গিয়ে তারা আর্থিক সংকট লুকান। সন্তানের সামনে স্বাভাবিক থাকতে, আত্মীয়-স্বজনের প্রত্যাশা পূরণ করতে—এসব মানসিক চাপ বাড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
শুধু ঢাকা নয়—জেলা শহর, উপজেলা সদর, এমনকি গ্রামেও মধ্যবিত্তের সংকট প্রকট। জেলা শহরের একজন শিক্ষকের আয় যতটা বাড়ছে, সন্তানের ভালো শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দেশে-বিদেশে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে নতুন চাপের মুখে পড়ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি ও বাজারের অস্থিরতায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। মধ্যবিত্তের এই বহুমুখী চিত্র নিবন্ধকে আরও জাতীয় মাত্রা দেয়।
অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে মধ্যবিত্তের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভোক্তা, করদাতা, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা—দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও করব্যবস্থার চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালের জুনে প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্য ও উদীয়মান মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ বাড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) বিশ্লেষণেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর প্রস্তাবিত কর কাঠামোর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। করব্যবস্থা এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত আয় করা মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতাও অযথা সংকুচিত না হয়। একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি মানবসম্পদ, সঞ্চয় ও ভোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।
ভবিষ্যৎ কী? মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য করব্যবস্থা, সাশ্রয়ী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন নীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা—এসব নীতি বাস্তবায়ন জরুরি। কিন্তু প্রয়োজন শুধু নীতির তালিকা নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কার।
একটি দেশের মধ্যবিত্ত শুধু তার বর্তমান অর্থনীতির প্রতিফলন নয়; তারা সেই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী। তাদের স্বপ্ন যদি ক্রমাগত ঋণ, মূল্যস্ফীতি, অনিশ্চয়তা ও ব্যয়ের চাপে সংকুচিত হয়, তবে তা শুধু অসংখ্য পরিবারের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়—দেশের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য শুধু কত মানুষ মধ্যবিত্তে উঠল তা নয়; বরং যারা মধ্যবিত্তে উঠেছে, তারা কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করতে পারছে—সেটাই আসল মাপকাঠি। আজকের মধ্যবিত্তের সংকট হলো—আয় আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই; চাকরি আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই; স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখার সামর্থ্য ক্রমশ কমছে।
লেখক : জহিরুল ইসলাম : গণমাধ্যমকর্মী, চকরিয়া-পেকুয়া, কক্সবাজার।
zahirulislam2933@gmail.com