বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪১ অপরাহ্ন
উচ্চশিক্ষা এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছেন, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ‘এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যামপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়।
এতে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্ম সন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হারে ভারত এ অঞ্চলে তৃতীয় (৮ দশমিক ৪ শতাংশ), শ্রীলঙ্কা চতুর্থ (৭ দশমিক ৯ শতাংশ), ব্রুনাই পঞ্চম (৭ দশমিক ৫ শতাংশ), ফিলিপাইন ষষ্ঠ (৭ দশমিক ৫ শতাংশ), ইরান সপ্তম (৭ দশমিক ৪ শতাংশ), মঙ্গোলিয়া অষ্টম (৭ শতাংশ), লাওস নবম (৬ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং ফিজি দশম (৫ দশমিক ১ শতাংশ) । বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন পর্যায়ে বেকারত্বের হার কত, তাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পার হয়নি- এমন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১ দশমিক ৮ শতাংশ) । প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যারা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকার সাড়ে ৮ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দেড় যুগ আগে ২০০০ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ । ২০১০ সালে তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের হিসাবে এই হার একই থাকে (৪ দশমিক ৪ শতাংশ)। বাংলাদেশে পুরুষের ক্ষেত্রে বেকারত্ব ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ও নারীর ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের বড়ো অংশ আবার নিষ্ক্রিয়। তারা কোনো ধরনের শিক্ষায় যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না, আবার কাজও খুঁজছেন না। দেশে এমন তরুণের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে এই হার বেশি, ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি । যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আর এই বেকারদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই সম্পূর্ণ কর্মক্ষম যুবক । ১৯৯০ সালের তুলনায় বেকারের সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। ১৯৯০ সালে দেশের বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০২ সালে এ হার ছিল ৮ শতাংশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে বেকারের সংখ্যা বলা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরো বেশি হবে । কারণ ঋতুভেদে (মৌসুমি বেকার) দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ে। এ হিসাব যুক্ত হলে বেকারের সংখ্যা হয়ত ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বলা চলে, দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষই কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে এমডিজি’র ভিত্তি বছরে দেশে বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ওই বছর একশজনের মধ্যে বেকার ছিলেন মাত্র তিনজন। ২০০০-০২ সালে বেকারত্বের এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ শতাংশে। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে বেকারত্বের হার বাড়ে ৫ শতাংশরও বেশি। ২০০৯ সালে এমডিজির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সালে বেকারত্বের হার কমানোর লক্ষ্যে দেশে ১৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
এখন পর্যন্ত পরিকল্পনার অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হলেও বেকারত্বের হার কমেনি। উলটো বেড়েছে। গত ১৮ বছরে দেশে বেকারত্বের হার কমার পরিবর্তে বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ । প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ভারত ও ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি। ভারতে বেকারত্বের হার ১১ শতাংশ আর ভিয়েতনামে ৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দাতা গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তা ছাড়া দেশীয় সম্পদের ব্যবহার ও বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের আরো সুযোগ সৃষ্টির জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। এতে বেকারত্ব অনেকাংশে কমে আসবে। দেশি-বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্য দেশের মধ্যে যে কোনো মূল্যে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০০ সালে দেশে এমডিজি বাস্তবায়ন শুরু করার পর থেকে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য ছিল তাতে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। দেশে দরিদ্রের হার কমিয়ে আনা, বেকারত্ব দূর করা এবং সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করাসহ এমডিজির ৮ লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্নত বিশ্ব বিপুল অর্থ বাংলাদেশকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। উন্নত বিশ্ব তা রক্ষা না করার কারণেই দেশে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের এক সদস্য বলেন, এমডিজি গ্রহণ করার সময় উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশসহ সকল উন্নয়নশীল রাষ্ট্রকে তাদের মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ৭০ শতাংশ অর্থ সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা এ পর্যন্ত কোনো বছরই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তহবিল সরবরাহ করেনি। তাই বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তবে অন্য সকল লক্ষ্য ব্যাপকভাবে সফলতার মুখ দেখেছে বলে তিনি মত দেন।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সহায়তা মেলেনি তাই বেকারত্ব কমেনি এ ধারণাটাই ভুল। বরং বলা যায়, বিগত দুই দশকে বিদেশি ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে বিদেশি সাহায্যনির্ভর প্রজেক্টের কারণে কর্মসংস্থান আরো নষ্ট হয়েছে। আমদানি নির্ভরতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় দেশের ছোট শিল্প- কারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে। বেকারত্ব পরিস্থিতি আরো প্রকট আকার ধারণ করতো যদি দেশের জনশক্তি রফতানি থেকে রেমিট্যান্স আয় না হতো ৷
তাই সরকারের এই বিদেশি সহায়তা না পাওয়ার ভাবনাটাই বদল করে অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। বেকার সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে বেকার সাধারণত তিন ধরনের। এক. যারা একেবারে কোনো কাজ করার ক্ষেত্র পায় না, দুই. কিছু কাজ করে কিছু সময় বসে থাকে, তিন. যথাযথ মজুরি পাচ্ছে না অর্থাৎ কাজ করে কিন্তু এত কম মজুরি পায় যে সেটা তার বা পরিবারের ভরণপোষণে কোনো কাজে আসে না। এ সংখ্যাটা খুব বড়ো একটি অংশ। এখন এদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তাদের মজুরি বৃদ্ধি পায়। এখন মজুরি বাড়াতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা তখনই বাড়বে যখন উৎপাদকরা পণ্য উৎপাদন করে তার ন্যায্যমূল্য পাবে। এগুলো প্রতিটি বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, এছাড়া পণ্য বিপণনে সমবায় ব্যবস্থা প্রচলন। এসব উদ্যোগ যদি সফলতার মুখ দেখে তবে অবশ্যই এই বেকারত্বের হার নেমে আসবে। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণের মুখাপেক্ষী না থেকে রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহার ও দেশীয় পণ্যের বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পের কোটামুক্ত ও শুল্কমুক্ত আন্তর্জাতিকভাবে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ আয় ব্যবস্থাকে জোরদার করার প্রতি তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।
লেখক: ড.ফোরকান আলী; গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ