বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম

মালার পুঁতি ও কনডমই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন শিশু শিক্ষার্থী মারিয়ার

হাফিজুর রহমান, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি :

নিখোঁজ থাকার পাঁচ দিন পর টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশু মারিয়ার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাশের একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া মালার ছেঁড়া পুঁতি ও ব্যবহৃত কনডমই এই নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।

পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া পুঁতিগুলো মারিয়ার গলার মালার অংশ, যা তার মা নিশ্চিত করেন। এ সূত্র ধরেই তদন্তে নতুন মোড় নেয়। পরে মারিয়া হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে সাজিদ (১৪) নামের এক কিশোরকে কৌশলে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং আরও দুই কিশোরের নাম প্রকাশ করে।

সাজিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ রাতভর অভিযান চালিয়ে বাড়ইপাড়া গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মৃদুল (১৬) এবং আব্দুর রহমানের ছেলে রায়হান কবীরকে (১৬) আটক করে।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তাদের আদালতে হাজির করলে সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সংশ্লিষ্ট আদালতের বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাগর তালুকদার, জান্নাতুন নাঈম মিতু ও সুরাইয়া পৃথকভাবে তিনজনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। কোর্ট ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ঘটনার দিন মারিয়াকে মুখ চেপে নির্যাতনের একপর্যায়ে সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। পরে মরদেহ গুম করার জন্য পাশের একটি পরিত্যক্ত ঘরের স্টিলের বাক্সে বস্তাবন্দি করে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়।

উল্লেখ্য, গত ২৬ জানুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় মারিয়া। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে প্রথমে সাধারণ ডায়েরি এবং পরে ১ ফেব্রুয়ারি ধনবাড়ী থানায় মামলা করেন তার বাবা উজ্জ্বল হোসেন। রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) ভোরে যদুনাথপুর ইউনিয়নের বাড়ইপাড়া গ্রামে মৃত শাহাদত হোসেন নান্নুর পরিত্যক্ত ঘর থেকে দুর্গন্ধ পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে ওই ঘরের ভেতরে থাকা স্টিলের বাক্স থেকে মারিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহত মারিয়া বাড়ইপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র উজ্জ্বলের সন্তান। সে বাবা-মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ির একটি ছোট ঘরে বসবাস করত। এ ঘটনার শুরু থেকেই এনটিভি, দৈনিক জনকণ্ঠ, মানবকণ্ঠ, ভোরের দর্পণ ও শান সাইনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের গতি আরও বেড়ে যায়।

এ ঘটনায় শুরুতে সন্দেহভাজন হিসেবে সুমন (২৬) ও রাফিউল (২২) নামের দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তদন্তে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিশোরদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

ধনবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নুরুস সালাম সিদ্দিক জানান,
“অভিযোগ পাওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অপরাধীদের আটক করা হয়েছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।”

সহকারী পুলিশ সুপার (মধুপুর সার্কেল) আরিফুল ইসলাম বলেন,
“অপরাধীরা সবাই কিশোর। তাই সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

নিহত শিশু মারিয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন ধনবাড়ী উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ নূরজাহান আক্তার সাথীসহ বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তারা মারিয়ার বাড়িতে গিয়ে সব সরকারি সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।

এ সময় ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ ও যদুনাথপুর ইউনিয়নের প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা রাসেল পারভেজ তমাল, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শওকত হোসেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সুবোধ মণ্ডল, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন, ধনবাড়ী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও এনটিভির সাংবাদিক হাফিজুর রহমান, যদুনাথপুরের ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান, বাবুল আখতার ও আব্দুল্লাহসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

নিহত শিশুর মা জবেদা, বাবা উজ্জ্বল হোসেন, বড় ভাই জুবায়ের হোসেন, নানা ময়নাল হোসেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানসহ এলাকাবাসী দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।


Classic Software Technology
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২০ বাঙলার জাগরণ
কারিগরি সহযোগিতায়: