শুক্রবার, ১৯ Jun ২০২৬, ১০:২৮ অপরাহ্ন
মুহাম্মদ নুরুন্নবী মুন্না, স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের সংবাদ মাধ্যম বিবেকের আলোকে সত্যকে তুলে ধরবে এবং মিথ্যার সাথে আপোষ করবে না। আমাদের যুব সমাজ যে পরিবর্তনের আকাঙ্খা করে, সেটা আমরা পেয়ে যাব। এখানে যারা ক্যামেরা ধরে আছেন, আমি দেখতে পাচ্ছি এখানে কোন বয়স্ক মানুষ তেমন নাই। আমি একজন যুবক এবং আপনারা আরো বেশি যুবক। আমরা আপনাদের স্বপ্নের কথা বলছি, প্রত্যাশার কথা বলছি। এ সমাজ আপনাদের, শুধু আমার নয়, সবার। আমরা সেই প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে যেতে চাই। আবার সেই সমাজের প্রয়োজনে যা উত্তম, যা কিছু ভালো, পরামর্শ দিয়েও আমাদেরকে সহযোগিতা করবেন। আমরা একসাথে লড়াই করতে চাই, এই সমাজকে মুক্ত করতে চাই, একটি মানবিক বাংলাদেশ করতে চাই, একটি ন্যায়্য বাংলাদেশ করতে চাই। এমন একটি বাংলাদেশ করতে চাই, গরীব আদালতে গেলে বিচার পাবে, ধনীও আদালতে গেলে বিচার পাবে। বিচারের বাণী আর নিভৃতে কাঁদবে না, সেই বাংলাদেশটা আমরা করতে চাই।
আজ শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে মুন্সীগঞ্জ শহরের পুরাতন কাচারী এলাকার একটি পার্টি সেন্টারে জেলা জামায়াত আয়োজিত বার্ষিক রুকন সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন ঢাকা অঞ্চল দক্ষিন জাময়াতের পরিচালক ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। জেলা জামায়াতের আমির আ. জ. ম রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে ও জেলা সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন রাজির পরিচালনায় এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি সিরাজুল আব্দুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান, মুন্সীগঞ্জ পৌর জামায়াতের আমির এএসএম বায়েজিদ, জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রিফাত হোসেন প্রমুখ।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের একটা বাজেট দেওয়া হয়েছে। ৫০-৬০ আইটেমে কর কমায়ে দেওয়া হয়েছে। বাজারে কোনো নিত্যপণ্যের দাম কি এক টাকা কমেছে? না। তাহলে কর কমানোর পরে কমে না কেন? কারণ, সব জায়গায় সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট আবার রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক প্রশ্রয়, আশ্রয় না পাইলে কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব জমিনের উপরে থাকবে না। এই আশ্রয়-প্রশ্রয়েই সিন্ডিকেট চালানো হয়। এই বাজেট, যে বাজেটে অনেক কর ছাড় দেওয়া হলো, সেখানে যদি জনগণের জীবনে কোনো পরিবর্তন না আসে, ইতিবাচক পরিবর্তন, স্বস্তি না আসে, তাহলে এটার বেনিফিট কে নিচ্ছে। আমরা চাই ব্যবসায়ীরাও বাঁচুক, আমরা চাই জনগণও বাঁচুক। কিন্তু ব্যবসাও আজকে একজন বললেন নারায়ণগঞ্জে, যে কতিপয় সিন্ডিকেটের হাতে এটা বন্দি হয়ে গেছে। এখন আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা আর ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছি না। অবশ্য মুন্সীগঞ্জ, এই জেলার নাম পবিত্র একটা নাম, মুন্সি, তাই না? মুন্সি হইলে একটা পবিত্র ভাব বুঝা যায়। যেখানে অনেক আল্লাহর নেক বান্দাগণ ছিলেন। এই নামের খাতিরে আমি বিশ্বাস করি যে মুন্সীগঞ্জে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। কিন্তু না, এই নামটুকুর সম্মান করে চাঁদা বাদ দেওয়া গেল না। সারা বাংলাদেশের একই চিত্র। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, একই চিত্র।
তিনি বলেন, কোন সময় যদি এমন হয় যে এই সংসদ এখন আর কোন যথার্থতা রাখে না, ন্যায় রাখে না, তখন সেই সংসদে এক সেকেন্ডও থাকার দরকার নাই। সংসদ জনগণের জন্য, জনগণের প্রয়োজনে আসবে না, সেই সংসদে আমাদের থাকার দরকার নাই। তবে আমরা সরকারকে সময় দিতে চাই, কিন্তু কতকাল? অনন্তকাল? বছরের পর বছর? যে ধারা সরকার শুরু করেছেন, সদিচ্ছার পরিচয় প্রথমে একটা। আমি দুই নম্বরটা চাচ্ছি না, চাঁদাবাজিটা বন্ধ করেন। সারাদেশে চাঁদাবাজি বন্ধ করলে মানুষের জীবনে তিন ভাগের এক ভাগ শান্তি ফিরে আসবে। এরপর আরেকটা বলব। আগে এটাতে হাত দেন। কারা এই দেশে চাঁদাবাজি করে। সবার কাছে ক্লিয়ার।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়, রাজনৈতিক কুটির চোর হয়েছে। আজকেই আমি নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ীদেরকে নিয়ে বসেছিলাম। শীর্ষস্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী বন্ধু, বোবা কান্না বলতে চায় না। একজন শুধু বলল, বড় কষ্টে আছে, আরামে নাই। এটা থেকে উদ্ধার করেন। আপনারা সবাই দেন। যেই দল তার কর্মীদেরকে সামাজিক অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে না, সেই দলের দেশ শাসন করার কোন অধিকার থাকতে পারে না। ঠিক। বিচার জনগণের হাতে।
২৪ এর উষালগ্নে কেউ কেউ এখন মাস্টারমাইন্ড হওয়ার দাবি করে বসছেন। আমরা সাথে সাথেই এটা প্রত্যাখ্যান করলাম। এই আন্দোলন, সংগ্রাম, অভ্যুত্থানের একক কোনো মাস্টারমাইন্ড নাই। এটার মাস্টারমাইন্ড এদেশের সারা জনগণ। সম্মানিত ভাইয়েরা, প্রথমে একজনকে মাস্টারমাইন্ড ঘোষণা করে দেওয়া হলো। আরেক দল তাদের নেতাকে মাস্টারমাইন্ড ঘোষণা করে বসলো। আবার সেই দলই ওই জটিল সময়ে প্রেসে কথা বলতে গিয়ে সেই দলের বাংলাদেশে থাকা শীর্ষ নেতা বললেন, এই আন্দোলন ছাত্রদের, এটার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। আশ্চর্য বিষয়! যে আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নাই, সে আন্দোলনের আবার আপনারা মাস্টারমাইন্ড, মাস্টারপিস নিয়ে যাবেন, এটা কেমন কথা? মানে জাতি সবসময় একটা অংশ নিজেরা থাকে সংশয়ের মাঝে দোদুল্যমান, জাতিকেও তারা সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। এভাবে একটা জাতি আগাবে কেমন করে? তারপর এই অধ্যায় স্বাভাবিকভাবে যাচ্ছে। আপনারা সাক্ষী। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কমপক্ষে ১৪০০ লোককে খুন করা হয়েছে ২৪ এ। আমরা চেষ্টা করেছি, আমি এবং আমার সহকর্মীরা, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করার। যদি আমাদের জানার বাইরে কেউ থাকে, আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমরা শহীদ পরিবারগুলা যাওয়ার ক্ষেত্রে কোন দল, কোন ধর্ম, এটা আমরা দেখি নাই। আমরা দেখেছি, বলেই আমরা বলেছি যে, শহীদরা কোনো দলের নয়, শহীদরা জাতির সম্পদ। শ্রদ্ধার পাত্র। আমরা সবাইকে এক চোখে দেখেছি। আমাদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে আমরা শহীদদের ঘরে ঘরে পৌঁছেছি। মা-বাবা যাদের ছিলেন, তাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাদের জন্য দোয়া করেছি। কারো কারো সন্তান এতিম হয়েছে, তাদেরকে চেষ্টা করেছি কোলে তুলে নেওয়ার, সান্ত্বনা দেওয়া। বিধবা স্ত্রীকে চেষ্টা করেছি সম্মান দেখানো, সান্ত্বনা দেওয়া। এভাবে আমরা ঘরে ঘরে ছুটে চলেছি। তখন আমাদের চোখে স্বপ্ন ছিল না, এখনই বাংলাদেশে একটা নির্বাচন হয়ে যাক আর আমরা গদিতে চলে যাই। এ স্বপ্ন আমরা দেখি নাই। তখনও তাজা রক্ত ভাসছে। হাসপাতালগুলোতে আহত, পঙ্গু লোকেরা চিৎকার দিচ্ছে। তাদের মিনিমাম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে কারো জীবনও চলে যাচ্ছে। এই লোকগুলার পাশে কীভাবে দাঁড়াব, সেটাই ছিল তখন আমাদের একমাত্র চিন্তা। চেষ্টা করেছি। এটা দাবি করি না যে, প্রয়োজন অনুযায়ী সব করতে পেরেছি।
যা আমাদের সামর্থ্য ছিল, সর্বোচ্চ সামর্থ্য উজাড় করে আমরা চেষ্টা করেছি এই অসহায় মানুষগুলার পাশে দাঁড়াতে। তারাই তো জাতিকে ঋণী করেছে। তাদের বুকের রক্তই তো জাতিকে ২৪ এনে দিয়েছে। ২৪ এসেছিল বলেই ২৬ এ নির্বাচন হয়েছে। ২৬ এ নির্বাচন হয়েছে বলেই আমরা কেউ বসেছি সরকারে আর কেউ বসেছি বিরোধী দলে। ২৬ না হলে কেউ সরকারও হতেন না, কেউ বিরোধী দলও হতেন না। সেই ফ্যাসিবাদেরই ক্ষমতা থাকত। এই ফ্যাসিবাদরা কী করেছে এদেশে আপনারা জানেন। শুধু জুলাইয়ের ১৪০০ মানুষ নয়, গোটা সাড়ে ১৫ বছর সারা বাংলাদেশে তারা গুম-খুনের রাজত্ব কায়েম করেছে। তারা লুণ্ঠনের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা শেয়ার মার্কেট ধ্বংস করে বহু মানুষকে হত্যার, আত্মহত্যার দিকে ফেলে দিয়েছে।
তারা ব্যাংকগুলা উজাড় করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। দেশে দেশে বেগম পাড়া গড়ে তুলেছিল। তারা আমাদের নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছিল। তারা আক্রোশ মেটানোর জন্য আমাদের নেতৃবৃন্দের ওপর মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদেরকে হত্যা করেছে। আমাদের সহকর্মীদেরকে বিনা বিচারে হত্যা করেছে। এবং এই কষ্টে শুধু আমরা ছিলাম না, সমস্ত রাজনৈতিক দল, ওলামায়ে কেরাম সবাই ছিল। হেফাজতের ওপর দুই দফা যে নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়েছে, সেই ফ্যাসিবাদী হাসিনাই চালিয়েছে। অসংখ্য আলেমকে খুন করা হয়েছে। কোরআনের হাফেজকে খুন করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে, মিথ্যা মামলায় জেলে পচানো হয়েছে। এত এত মানুষের ত্যাগ-কুরবানির বিনিময়ে ২৪ এ যে পরিবর্তন আসলো, মানুষ আশা করেছিল, আমাদের পচা রাজনীতির পরিবর্তন হবে। এ রাজনীতিতে আর চাঁদাবাজি থাকবে না। এ রাজনীতিতে ঘুষ-দুর্নীতি থাকবে না। এই রাজনীতি আর দলীয়করণ হবে না। দেশের সবকিছুতে দলের লোকদেরকে বসায় ফেলতে হবে, এটা আর হবে না। এদেশে কেউ রাজা হবেন না। জাতির সেবক হবেন। জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। জাতির ইচ্ছায় ক্ষমতায় বসবেন, জাতি অপছন্দ করলে চলে যাবেন।